১৫ই জুলাই
সাধারণ দিনের মতোই কলেজ (বগুড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট) যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলাম। তবে মনে ভিতর কেমন অস্বস্তি লাগতেছিল। বন্ধু কে ফোন দিয়ে বললাম রেডি হতে। সে বলে, তাহলে আজ যাবি? আমি বললাম চল যাই। বন্ধু বলল, আন্দোলনের যাওয়ার কথা বাসায় জানলে সমস্যা হতে পারে! আমি বললাম, চল এক দিনই তো।
বন্ধু বলল, আচ্ছা ১২ টাই বের হই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ আর ও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা একত্রে ৫৬% কোটা বাতিল করার জন্য যৌক্তিক আন্দোলন শুরু করে।
বগুড়ায় অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। ১৪ই জুলাই আন্দোলনে যোগ না দিতে পেরে, ১৫ জুলাই আমি, আমার বন্ধু শান্ত আন্দোলনে যোগ দিই। সেই দিনের আন্দোলনে পলিটেকনিক ইন্সটিউটের কম বেশি ৫০ শিক্ষার্থী ছিল।
সেই দিনের স্লোগান “কোটা না মেধা? মেধা মেধা”
১৫ই জুলাই স্বৈরাচার সরকার শিক্ষার্থীদের রাজাকার বলায়, ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন স্লোগান “তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার”
১৬ই জুলাই
বগুড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে কোটা বাতিল আন্দোলনে দেড় হাজার নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের মিছিলে ছাত্রলীগ দেশি অস্ত্র (চাপাতি, দা, রাম দা, কুড়াল ইত্যাদি) দিয়ে পুলিশের উপস্থিতি তে হামলা করে। অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী লাঠি, বাশ দিয়ে ছাত্রলীগদের ধাওয়া দিলে তারা নিজ অবস্থান থেকে পালিয়ে যায় এবং পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীরা বগুড়া বনানীতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবোরধ করে। অন্যদিকে বগুড়ার প্রান কেন্দ্র সাতমাথায় বগুড়ার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক আন্দোলন করতেছিল। এখানেও ছাত্রলীগ দেশি অস্ত্র দিয়ে আক্রমন করতে এসে, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের ঐক্য ভেংগে দেওয়ার জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হলো। এই দিনে, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বীর আবু সাইদ ভাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়।
১৮ ই জুলাই
প্রত্যেক শিক্ষার্থীর চিন্তা এবং অভিজ্ঞতার বাহিরের ছিল দিনটি। পুরো শহর ছিল পুলিশ, বিজিবি, র্যাব দিয়ে ভরপুর। বগুড়া জেলার সকল শিক্ষার্থী সাত মাথায় শান্তি পূর্ণ মিছিল করবে। তবে কেউ সেদিন একত্র হতে পারে নি। ২০-৩০ জন একত্রে হলে পুলিশ গুলি করা শুরু করেছিল। যা ছিল সকলেও ধারনার বাইরে। সাত মাথা জলেশ্বরীতলা তে কোনো মিছিল হতে দেয় নি পুলিশ। পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছে অনেক শিক্ষার্থী। সকল শিক্ষার্থী আবারো বনানী ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোেধ করতে যাওয়ার পথে, বগুড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এর সামনে ৯-১০ গাড়ি পুলিশ, ব্যাটালিয়ন, বিজিবি ফোর্স নিয়ে বের হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা টেকনিক্যালের গেটের সামনে রাস্তা অবরোধ করে আটকে দেয়। ওই মুহূর্তে পুলিশ গুলি করা শুরু করে। ওই মুহূর্তে প্রথম টিয়ার সেল এর গ্যাস এর অনুভব করি। আর চোখ, মুখ জলা শুরু হয় স্থানীয় লোকেদের সাহায্যেই সাময়িক স্বস্তি বোধ করি। আনুমানিক দুপুর ১ টা থেকে বিরতি নিয়ে নিয়ে রাত ৮ টা পর্যন্ত গুলি চালিয়েছে। জামিল মাদরাসা এলাকার মানুষ যথেষ্ট সাহায্য করেছে, তারা সাহায্য না করলে পুলিশ মোকাবেলা করা আরো কঠিন হতো। যা বলে বুঝানোর মতো না। আমরা ওই এলাকার মানুষের জন্য কৃতজ্ঞ। এই দিন থেকে টানা ৫ দিন সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে।
১৯ জুলাই
১৯ জুলাই থেকে শুরু অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ। তবুও সাধারণ শিক্ষার্থীরা দমে যায় নি। কারফিউ এর মধ্যে আন্দোলন শুরু। উপর দিকে পুলিশ গুলি না চালালেও সারা দেশে গণগ্রেফতার শুরু হয়ে যায়। এক একটি দিন যায় দেশের অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। তবে ইতিবাচক না নেতিবাচক পরিবর্তন। বগুড়ার সাতমাথা, সেউজ গাড়ি থেকে অনেক শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার করে পুলিশ।
৩০-৩২শে জুলাই
কারফিউ প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় জলেশ্বরীতলায়। তবে গন গ্রেফতারের ভয়ে আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল কম।
৩৩শে জুলাই
শুক্রবার আন্দোলন ছিল দুপুর ৩টায়। কেন্দ্র কালিমন্দির, ছিল মুষুলধারে বৃষ্টি। গ্রেফতারের ভয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেই দিন হাজারো ছাত্র ছাত্রীরা উপস্থিত। সেই দিন গুলি চালায় নি পুলিশ। সেই দিন যত অভিভাবক তত ছাত্রী আর হাজার হাজার মানুষ ৯ দফা দাবি নিয়ে হাজির। সেই দিনে একজন শিক্ষার্থী আরেক জন শিক্ষার্থীদের দেখে সাহস তৈরি করে।
৩৪শে জুলাই
আমার জীবনের স্মরণীয় একটি দিন। হাল্কা হাল্কা বৃষ্টি হলেও আগের দিনের শক্তি নিয়ে প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় আবারও হাজির সেই ৯ দফা দাবি নিয়ে। আজ শিক্ষার্থীদের সাহস আগের দিনের থেকে আরও বেশি। দিন যত যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের সাহস শক্তি তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দিন জিলা স্কুলের গেটের সামনে শিক্ষার্থীরা পুলিশ কে ধাওয়া দেয়। শুরু হয় আবার গোলাগুলি। এতো পরিমান টিয়ার সেল ছুড়েছিলো যে জজ কোর্ট এর সামনে ধোঁয়া দিয়ে সবার শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা শুরু হয়েছে। বৃষ্টির জন্য কোন কিছু তে আগুনও দেওয়া যাচ্ছিল না। এমন সময় মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় মতো করে আশেপাশের ৭তলা,১০ তলা বিল্ডিং থেকে সবাই পুরাতন পেপার ফেলে দিচ্ছিলো। শুধু আগুন ধরানোর জন্য। কেউ টুথপেস্ট নিয়ে দাড়িয়ে আছে। যার যার লাগবে নিয়ে মুখে,চোখের নিচে দিচ্ছে যেন টিয়ারশেলের ঝাঁজ কম লাগে। এতো মানুষের কষ্ট, আবার অসংখ্য মানুষের সাহায্য। যা নিজে চোখে না দেখলে বলে বোঝানো সম্ভব না। ঘন্টা খানেক পরে বিক্ষুদ্ধ জনতা, শিক্ষার্থীরা সাতমাথা পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ায়, প্রি-ক্যাডেট স্কুলের সামনে থেকে কালিমন্দির পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীদের পুলিশ চার পাশ ঘিরে নিয়ে গুলি করা শুরু করে সাথে সাউন্ড গ্রেনেড। অল্প যায়গার মাঝে ৩০০-৪০০ শিক্ষার্থী অলি গলি, সব ফ্লাটে ঢুকে পরা শুরু করে। এমন সময় আমার পায়ে তিনটা গুলি লাগে। হাতে রাবার বুলেট লাগে। এই গুলির থেকে সাউন্ড গ্রেনেড এর শব্দে যে ভয় পেয়েছিলাম মনে হচ্ছিল আমি মারা যাব! জীবনে এতোটা ভয় মনে হয় কখন ও পাইনি। এমন পরিস্থিতিতে, জলেশ্বরীতলায় যে সকল ফ্লাটে আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল তাদের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। যেই বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলাম সেই বাসার একটা আন্টির কাছে আমি পানি খাইতে চাই। কিন্তু আন্টিরা ওই দিনে বাসায় নতুন
কিন্তু আন্টিরা ওই দিনে বাসায় নতুন উঠেছিল। তিনি নিজেও জানতো না জগ,গ্লাস কোথায় আছে। তার চোখে পানিতে ছল ছল করতেছিল আমাদের অবস্থা দেখে আর আমাকে বলতেছিল,আমার হাতে নিয়ে তোমায় পানি খাওয়ায় দিলে কি তুমি কিছু মনে করবা? এই বলে তিনি কন্না শুরু করে দেয়।অর্থাৎ মানুষ নিজের অবস্থান থেকে সাহায্যর কোনো কমতি রাখে নি। তাদের এই অবদান কখনও ভুলব না।
৩৫শে জুলাই
গুলি লাগায় হাত পায়ের প্রচুর ব্যাথায় সেই দিন আন্দোলনে আর যেতে পারিনি। তবে এই দিন বগুড়া শহরে ওপেন ফায়ার করেছে। বলতে গেলে ৩-৪ ঘন্টায় ৮ জন মারা গিয়েছে পুলিশের গুলিতে।
৩৬শে জুলাই
পায়ের গুলি লাগা জাইগায় ইনফেকশন হয়ে যায় ধীরে ধীরে। সেই দিন সকাল ১১ টাই আন্দোলন থাকলেও যেতে পারি নি। হাতে রাবার বুলেট লাগছিলো দুপুর ১ টাই বাসায়, আমি, দাদাভাই(আমার বড় ভাই), মামনি তিন জনে লুডু খেলতেছিলাম। দুপুর ২ টার পরে দাদাভাই বাইরে গেল বলে গেলো সেনাপ্রধান ভাষন দিবে যাই শুনে আসি। আমার পায়ের ব্যাথা শুয়ে আছি, মনে হচ্ছে বাসার পাশে দিয়ে মিছিল যাচ্ছে এমন একটা আওয়াজ পাচ্ছি ছাদে গিয়ে দেখি না এমন কিছু না। বাসায় এসে দেখি দাদাভাই ফোন দিয়েছে বলতেছে, “শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছে।” প্রথমে এই কথা সত্যি বিশ্বাস হয় নি। সাথে সাথে বাসা থেকে বের হয়ে দেখি সবাই সাত মাথা যাচ্ছে বিজয় মিছিল নিয়ে। বাসার পাশে এক ভাইকে ফোন দিয়ে জানালাম সেইও বিশ্বাস করে নি। পরে, আমার পায়ের ব্যাথা নিয়ে ওই ভাইয়ের কাধে ভর দিয়ে হেটে হেটে সাতমাথা যাওয়া। মানুষ একে অপরকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। কোলাকুলি করতেছে ইত্যাদি। সবার মুখে এক কথা যে, দেশ স্বাধীন হয়েছে।
তবে এই স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি, দেশটা স্বৈরাচার মুক্ত স্বাধীন দেশ হবে বলে মানুষ জীবন দিয়েছে।
দেশটা সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য কেউ নিজের এক পা ত্যাগ করেছে। সঠিক হাত দ্বারা পরিচালনা করার জন্য নিজের হাত ত্যাগ করেছে। এছাড়া আহত অজস্র ভাই বোন। আমরা তাদের কখনও ভুললিব না।
তাদের উৎসর্গ করে, জুলাইয়ের দিনগুলো লেখা।




