জুলাই আন্দোলনের ২ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলনে প্রায় সবদিনই অংশ নিয়েছি। এরমধ্য ১৪ জুলাই রাতের মিছিল ছিল সবচেয়ে সাড়া জাগানো। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগ হামলা করে। এই হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশত শিক্ষার্থী আহত হয়। ছাত্রলীগের হামলার সময় আমিও আন্দোলনে ছিলাম, সৌভাগ্যক্রমে সেদিন হামলা থেকে বেঁচে যাই। ১৬ জুলাই শহীদ মিনারের আন্দোলনে অংশ নিই, সেদিন বিপ্লব চরম আকার ধারণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ হল থেকে সেদিন রাতে ছাত্রলীগের হামলাকারী নেতাদের বের করে দেওয়া হয়, কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পালিয়ে যায়।
আমাদের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে ছাত্রলীগ নেতারা পালিয়ে যায় ১৭ জুলাই সকালে, এরপর হলকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র রাজনীতি মুক্ত ঘোষণা করা হয়। ১৭ জুলাই দুপুরে সিন্ডিকেট মিটিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল গুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়, সন্ধ্যা ৬ টার মধ্য হল ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়, আমি তখন ১৬ জুলাইয়ে শহীদের গায়েবানা জানাযায় অংশ নিতে ভিসি চত্বরে। হলে ফিরে এসে দেখি কেউ কেউ ব্যাগপত্র গুছিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। তবে বেশিরভাগ ছাত্র হলেই আছে, বেশিরভাগ ছাত্রই হল ছেড়ে যেতে আগ্রহী না, হলেই থেকে সবাই আন্দোলন চালিয়ে যেতে চায়। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা হলেই থাকবো, চলে যাব না। সবাই যদি চলেও যায় কিছু সংখ্যক ছাত্রও যদি থাকে তারপরও আমরা থাকবো। কিন্তু চলে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিনেও দুপুরের পর সবাই একে একে চলে যাওয়া শুরু করলো, একজনের দেখিদেখি আরেকজন গিয়ে হল মোটামুটি শূন্য। আছি মাত্র ৫-৬ জন। ভাবছি কি করবো, চলে যাবো না-কি থাকবো, এই ৫-৬ জন থেকেই কি করবো। আবার ভাবছি চলে গেলে আর কখনো হলে আসা হবে না হয়তো, ছাত্রলীগ আবারো হল দখল করবে, আমাদের আর হল আসতে দেবে না। শেষ পর্যন্ত চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আর কোনদিন হলে আসা হবে না ভেবে মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ সব জিনিসপত্র নিয়ে বিকাল ৫ টার দিকে হল থেকে বের হলাম।
যাবো লালবাগে রবিউলের বাসায়, সেখানে আগে মামুন গিয়েছে, তাকে সাথে নিয়ে বগুড়ায় চলে যাওয়ার কথা। হল থেকে বের হওয়ার সময় সাথে আছে আমার রুমমেট ইব্রাহিম, ইব্রাহিমকে আজিমপুর থেকে বাসে তুলে দিয়ে আমি মামুনকে সাথে নিয়ে কল্যানপুর গিয়ে, কল্যানপুর থেকে বগুড়ার বাসে উঠবো। কিন্তু আজিমপুর গিয়ে দেখলাম বাস চলাচল বন্ধ। জানতে পারলাম কারওয়ান বাজার থেকে বাস চলছে। ইব্রাহিম একা কারওয়ান বাজার একা যেতে একটু অনিরাপদ বোধ করছে। তাই মামুনকে ফোন করে বলে দিলাম একাই কল্যানপুর চলে যেতে, আমি ইব্রাহিমকে কারওয়ান বাজার থেকে বাসে তুলে দিয়ে কারওয়ান বাজার থেকে কল্যানপুর চলে যাবো। তারপর সেখান থেকে মামুনের সাথে বগুড়া যাব।
পলাশী থেকে রিকশা নিলাম কারওয়ান বাজার যাওয়ার জন্য। ইব্রাহিম ও আমি যাচ্ছি, নীলক্ষেত মোড়ে গিয়ে দেখলাম পুলিশ, বিজিবি বন্দুক ও গাড়ি নিয়ে রাস্তায় টহল দিচ্ছে, কেমন জানি যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। কাঁটাবন পৌঁছে দেখি হাতিরপুল দিক থেকে ১০-১২ জন লোক হাতে লাঠি, রড, স্ট্যাম্প নিয়ে কাঁটাবনের দিকে আসছে। ইব্রাহিম দেখে একটু ভয় পেয়ে গেছে, ভেবেছে আমাদের উপর হামলা করতে পারে। রিকশাওয়ালাকে ইব্রাহিম বলছে রিকশা ঘুরিয়ে নিয়ে পেছনে যেতে। কিন্তু রিকশাওয়ালা বললো কিছু হবে না, একপাশ দিয়ে আস্তে করে চলে যাব বরং ঘুরিয়ে পিছনে নিলে ওরা আমাদের সন্দেহ করে এসে হামলা করতে পারে।
রাস্তায় অনেক লোকজন, আমারও মনে হলো এতো মানুষের মধ্যে হামলা করবে না হয়তো, আর হামলা করার কারণও নেই, তারা আমাদের চেনার কথা নয়। এইটুক চিন্তা করতে করতে ওরা ততক্ষণে আমাদের দেখে সন্দেহ করে আমাদের রিকশার দিকে এগিয়ে এসেছে। ৪-৫ জন রিকশা ঘিরে ধরেছে, বাঁকিরা একটু দূরে। তারা আমাদের কাছে এসেই কোন কিছু জিজ্ঞেস না করেই ইব্রাহিমকে টেনে রিকশা থেকে নামিয়ে বললো তুই দৌঁড়ে এখন থেকে চলে যা। ইব্রাহিম যেতে রাজি হচ্ছিল না। তখন ইব্রাহিমকে কয়েকটা বাড়ি দিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দিল, ইব্রাহিমকে ধাওয়া করলো পিছনে দুইজন। আমি আর ইব্রাহিমকে দেখতে পেলাম না।
এদিকে তিনজন মিলে আমাকে ঘিরে ধরলো, আমি রিকশার উপরেই আছি। দুইপাশ থেকে লাঠি দিয়ে দুইজন বাড়ি দিচ্ছে, বাঁকিরা রিকশা ঘিরে ধরে আছে কেউ যাতে রিকশার কাছে এগিয়ে আসতে না পারে। তারা আমাকে লাঠি দিয়ে কাঁধ, দুই হাত ও পিঠে বাড়ি দিচ্ছে, আর জিজ্ঞেস করছে, “আন্দোলন করিস”, “ছাত্রলীগকে হল থেকে বের করে দিস”, “খুব নেতা হয়েছিস, আমরা তোকে ছাড়বো!” ইত্যাদি। বেশ কিছুক্ষণ আঘাতের পর আমার অবস্থা যখন মোটামুটি খারাপের দিকে তখন আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসল, লোকজনের এগিয়ে আসা দেখে হামলাকারীরা চলে গেল। আমার সাথে থাকা ব্যাগগুলো রাস্তায় ছাড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে গেছে, লোকজন সেগুলো রিকশায় তুলে দিয়ে রিকশাওয়ালাকে বললো হাসপাতালে নিয়ে যেতে। আমি রিকশায় ভালো করে বসে থাকতে পারছি না, আবার শুয়ে থাকাও যাচ্ছে না। রিকশাওয়ালকে বললাম সিএনজিতে তুলে দিতে। কিছুদিন এগিয়ে গিয়ে রিকশাওয়ালা সিএনজিতে তুলে দিলো।
সিএনজি চালককে বললাম কল্যানপুর নিয়ে যেতে, কল্যানপুর আমার ফুফুর বাসা। আশেপাশের হাসপাতালে গেলে দেখাশোনার মতো কেউ থাকবে না। কল্যানপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে গেলে সুবিধা হবে। সিএনজিতে ওঠার পর তীব্র পানি পিপাসা লাগলো, মনে হচ্ছিলো অজ্ঞান হয়ে যাবো, সিএনজি চালক পানি খাওয়ানোর পর একটু ভালো লাগলো। সিএনজি চালককে ফুফুর বাসায় ঠিকানা ও ফোন নম্বর দিয়ে রাখলাম, যাতে আমি অজ্ঞান হয়ে গেলেও বাসায় পৌঁছে দিতে পারে। যাচ্ছি আর ভাবছি ইব্রাহিমের কি হলো তাকেও কি আমার মতো মারল না-কি ইব্রাহিম পালাতে পারলো, এরমধ্যে ব্যাগে থাকা ফোন বেজেই যাচ্ছে, আমি ফোন ধরার মতো অবস্থায় নেই, হাসপাতাল থেকে ফেরার পরে দেখলাম ফোন গুলো ইব্রাহিম করেছে, জানলাম ইব্রাহিমকে তারা ধরতে পারে নি, ইব্রাহিম সুস্থ আছে।
আল্লাহর রহমতে ভালো ভাবেই বাসায় পৌঁছালাম। সেখান থেকে ফুফা হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে সেই রাতেই ফুফুর বাসায় চলে গেলাম। বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা করছিল, কিন্তু শরীরের যে অবস্থা, কয়েকদিনের মধ্যে বাড়িতে যাওয়ার উপায় সেই, তারপর শুরু হলো কারফিউ।
একসপ্তাহের বেশি সময় ফুফুর বাসায় থেকে কারফিউ শিথিলের পর বগুড়ায় চলে গেলাম। সুস্থ হতে দুই সপ্তাহ সময় লাগলো। এরমধ্যে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো, সুস্থ হওয়ায় পর বগুড়ায় আবারো আন্দোলনে অংশ নিলাম। সরকার পতন হয়ে দেশে নতুন ইতিহাস রচিত হল।
স্মৃতিচারণ করার ইচ্ছা ছিল না, কয়েকদিন আগে আমাদের হল গেটে আন্দোলনের কিছু ছবি বাঁধাই করে লাগিয়েছে, তার মধ্য আমার আহত একটি ছবি রয়েছে, হল থেকে বাইরে যেতে আসতে ওই ছবির দিকে নজর পড়ে, সেদিনের স্মৃতি মন হয়, তাই স্মৃতিচারণ করলাম।
আমার উপর হামলা হওয়ার সময় আমি তাদের চিনতে পারি নি। তাদের দেখে মোটামুটি শিক্ষিত মনে হয়েছিল, টোকাই টাইপের নয়। তবে তারা ছাত্রলীগের এটা নিশ্চিত ছিলাম। হামলা হওয়ার পরদিন থেকেই ভাবছিলাম এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, না-কি বাইরের কোন কলেজের ছাত্রলীগ। সুস্থ হওয়ায় পর খোঁজ নিয়ে কিছু প্রত্যক্ষদর্শী ও হামলার শিকার হওয়া কিছু ছাত্রের মাধ্যমে জানলাম ওইদিনের হামলার নেতৃত্বে ছিল বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু ইউনুস। আমি হামলাকারীদের তখন না চিনলেও ২-৩ জনের চেহারা মনে আছে, পরে আবু ইউনুসের ছবি দেখে শনাক্ত করতে পেরেছি, সেটা আবু ইউনুসই ছিল।
একদিক দিয়ে ভাবলে বলা যায় সেদিন ভাগ্য খারাপ ছিল, তাই তাদের হাতে ধরা পড়ে হামলার শিকার হয়েছিলাম। আরেক দিক দিয়ে ভাবলে বলা যায়, সেদিন ভাগ্য ভালো ছিল বলে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। তারা আরো মারতে পারতো। হাতে, পিঠে, কাঁধে না মেরে মাথায় মারতে পারতো। মাথায় মারলে অবস্থা আরো খারাপ হতো, বেঁচে থাকা হতো কি-না! ভাগ্য ভালো দেখে আল্লাহর রহমতে অল্পের জন্য সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম।




