তাহমিদ ভূঁইয়া তামিম, ১৫ বছর বয়সী এক প্রাণোচ্ছ্বল কিশোর। নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল সে। পল্লীচিকিৎসক বাবা আর গৃহিণী মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে তামিম ছিল সবার বড়। তার ১৩ ও ৩ বছর বয়সী দুটি ছোট বোন রয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেট নিয়ে ভীষণ মেতে থাকত তাহমিদ, স্বপ্ন দেখত একদিন দেশসেরা ক্রিকেটার হওয়ার। ছেলের স্বপ্ন পূরণে কোনো কিছুতেই কার্পণ্য করতেন না বাবা-মা। ক্রিকেট এর প্রতি আগ্রহ দেখে ব্যাট, প্যাড থেকে শুরু করে ক্রিকেটের যাবতীয় সরঞ্জাম কিনে দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু এখন এসব শুধুই স্মৃতি।
১৮ জুলাই,বৃহস্পতিবার ঘটনার দিন তাহমিদ যোহরের নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করে এবং দুপুরে পরিবারের সবার সঙ্গে খাবার খায়। খাওয়া শেষে বিছানায় শুয়ে ছোট বোন লিনাতের সঙ্গে মুঠোফোন নিয়ে খেলছিল তাহমিদ। “বাবা কিছুক্ষণ ঘুমাও “ এই কথা বলে তাহমিদের বাবা পাশের রুমে শুতে যায় তখন মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর তাহমিদের মা বাজারে গেলে বাবার কথা না শুনে সবার অজান্তে তাহমিদ ঘর থেকে বের হয়ে যায় । তাহমিদকে রাস্তার দিকে যেতে দেখে এক প্রতিবেশী নারী সাবধান করেন ঝামেলা চলছে সামনে না যেতে। কিন্তু তাহমিদ সামনে এগিয়ে যায় এবং জেলখানার মোড় এলাকায় মিছিলে যোগ দেয়। হাতে পতাকা নিয়ে গলায় স্লোগান তোলে—“ভাই হত্যার বিচার চাই।“
সেদিন সারাদেশের মতো উত্তাল নরসিংদীও। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জেলখানা মোড় এলাকায় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।ঠিক তখনই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশের নির্বিচার গুলি। ঘাতকের বুলেট এসে লাগে তাহমিদের শরীরে মুহূর্তেই তাহমিদ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে । তার পেট ও বুক থেকে অঝোরে রক্ত ঝরতে থাকে। আন্দোলনকারীরা গুলিবিদ্ধ তাহমিদকে জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে তাহমিদকে কোথাও না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। পরে খবর আসে, তাহমিদ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাহমিদকে খুঁজতে এসে প্রাইম হাসপাতালের পাশে মসজিদের কাছে তার বাবা রফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া দেখেন, আন্দোলনকারীরা লাল-সবুজের পতাকা মুড়িয়ে স্ট্রেচারে করে তাহমিদের নিথর দেহ নিয়ে আসছেন। চোখের সামনে ছেলের প্রাণহীন শরীর দেখে তিনি স্থির থাকতে পারেননি। বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা তাহমিদের লাশ সামনে রেখে স্লোগান দিতে থাকেন। লাশসহ মিছিলটি যখন হাসপাতাল থেকে স্টেডিয়াম ফটক দিয়ে জেলখানা মোড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, পুলিশ ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে আবারও গুলি চালাতে শুরু করে। মাত্র ১০০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে রফিকুল ইসলাম অসহায় চোখে দেখলেন, তার ছোট্ট ছেলেটার নিথর দেহেও পুলিশের গুলি এসে আঘাত করছে, তার মৃত সন্তানটিকেও ছাড় দিচ্ছে না ঘাতকরা। এ নির্মম দৃশ্য দেখে অসহায় বাবা আর্তনাদ করতে থাকেন। আন্দোলনকারীরা তাকে পুলিশের গুলি থেকে বাঁচাতে টেনে মসজিদের ভেতরে নিয়ে যান। বাবার চোখের সামনে সন্তানের লাশ, আর সেই লাশের ওপর মুহুর্মুহু গুলি এমন এক অমানবিক হৃদয়বিদারক ঘটনা্র সাক্ষী ১৮ জুলাই,২০২৪। এই বীভৎস ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যামেও ছড়িয়ে পড়ে। তাহমিদের লাশে পাওয়া যায় অসংখ্য বুলেটের চিহ্ন। ১৫ বছরের এই শিশুর বুক ঝাঁঝরা করে দিতে একটুও বুক কাঁপেনি স্বৈরাচারের দোসরদের।গোলাগুলি থেমে গেলে শিক্ষার্থীদের সহায়তায় তাহমিদের লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন রফিকুল ইসলাম । ।তাহমিদের প্রিয় বিদ্যালয়ের আঙিনায় ও স্থানীয় ঈদগাহে দুই দফা জানাজা শেষে চিনিশপুর কবরস্থানে রাতেই তাকে দাফন করা হয়। ছেলের ময়নাতদন্ত করতে রাজি হননি রফিকুল ইসলাম । তিনি বলেছিলেন, “পুলিশ সবার সামনেই গুলি করে ছেলেকে মেরেছে, ময়নাতদন্ত করে আর কী হবে? ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না।”
তাহমিদের পরিবার একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ । মা যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারেন না তার নাড়ী-ছেড়া ধন আর এই পৃথিবীতে নেই। বাবা কি কখনো ভেবেছিলেন তার এই আদরের সন্তানকে এমন নির্মম ভাবে হত্যা করা হবে? আন্দোলনের দিনগুলোতেতাহমিদ তার মা্কে বলেছিল, “মা, আমারও ইচ্ছে করে ঢাকায় গিয়ে আন্দোলনে যোগ দিতে। সবাইকে তো মেরে ফেলছে, আমার কিছুই ভালো লাগছে না।” মা তাকে শান্ত করে বলেছিলেন, “তুমি গিয়ে কী করবে? তোমাকেও তো মেরে ফেলবে।” তাহমিদের জবাব ছিল, “মরলেও শহীদ হব।” দেশের করুণ পরিস্থিতি এই ১৫ বছরের বাচ্চা ছেলেকেও ভাবিয়েছে। তাহমিদের বোন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছে, “সব সময় স্কুল থেকে একসঙ্গে আসা-যাওয়া করতাম, রাত দুই-তিনটা পর্যন্ত গল্প করতাম ভাইয়ার সঙ্গে। এখন যখন একা থাকি, তখন ভাইকে আরও বেশি মনে পড়ে।” তার একটাই চাওয়া এই রাষ্ট্রের কাছে —ভাই হত্যার বিচার।
পাড়ার মাঠে ছেলেপেলেরা দলবেঁধে এখনো ক্রিকেট খেলে কিন্তু তাহমিদ নেই। আর কখনো সে মাঠে গিয়ে ছক্কা হাঁকাবে না , মা বাবার কাছে আবদার করবেনা ,বোনের সঙ্গে খুনসুটি করবে না, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়ার মুহূর্তগুলোও আর ফিরবে না। পরিবারের প্রত্যাশা, তাহমিদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, তার রক্ত যেন ন্যায়ের পথে সংগ্রামের অমর প্রতীক হয়ে থাকে।
এই বাংলাদেশে তাহমিদের হত্যাকারীদের বিচার হবে তো?
শহীদ তাহমিদের নিথর দেহ, গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগ মুহূর্তেও যে পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, রাইজিং বিডি, বাংলা নিউজ টুয়েন্টিফোর, ও কিশোর ডাইজেস্ট
লিখেছেন: তাবাসসুম নেওয়াজ উর্মী, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
![]()




