মেডিকেল হেল্পলাইন ও আমার ‘অর্জন’
১৮ জুলাই ইন্টারনেট বন্ধের এক বা দুইদিন আগে মুগদা মেডিকেলের স্টুডেন্টদের উদ্যোগে ইমার্জেন্সি মেডিকেল হেল্প লাইন চালু হয়। আমাকে এক স্টুডেন্ট নক দিয়ে জিজ্ঞেস করসিলো স্যার আপনার নাম্বার এড করতে চাচ্ছি হেল্প লাইন লিস্টে।
প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। একটা মাত্র নাম্বার আমার। এর আগেও বহুবার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সার্ভেইলেন্সে ছিলাম। সাহস করে সম্মতি দিলাম।
এরপর বুঝলাম এটা ছিল আমার এই কাওয়ার্ড জীবনের শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত।
আমাদের ইমার্জেন্সি মেডিকেল টিমের নাম্বার যে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও চলে গেছে বুঝলাম যখন সৌদি আরব থেকে একজন উৎকন্ঠা নিয়ে ফোন দিল ভাই কী হচ্ছে কোন খবর পাচ্ছি না।
যখন সারাদেশে ব্রডব্যান্ডও বন্ধ হয়ে গেল তখন ভাবসিলাম। সব শেষ।
কারণ স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে রাখার মাধ্যম ছিল এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
এদিকে ফোন কলে রেগুলার ট্যাপিং হবে বিদ্রোহীদের খুঁজে খুঁজে বিদ্রোহের প্ল্যান বাঞ্চাল করবে এটাই স্বাভাবিক।
আর মানুষ যোগাযোগ করতে না পারলে আন্দোলনের পরিকল্পনা, কোথায় জড় হবে কীভাবে জানাবে সবাইকে আমার মাথায় আসছিলো না।
নেট নাই তো বিদ্রোহও নাই। সবগুলো টিভি চ্যানেল তখন বিটিভি।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আসতে শুরু করল একের পর এক কল।
ব্র্যাকের এক ছেলে জানালো – চোখে গুলি লাগসে। অনেক ব্যথা। কী করব। বের হতে দিচ্ছে না। এম্বুলেন্সও ঢুকতে দিচ্ছে না। কোন মেডিলেল কিটও নাই।
খুব অসহায় ফিল করতেসিলাম তখন। বললাম পানির ঝাপটা দাও। কিছুটা আরাম লাগবে। এর থেকে বেশি কিছু সাজেস্ট করার মত অপশন তো নাই।
এআইইউবির এক মেয়ে ফোন দিল – ভাইয়া গতকাল টিয়ার শেল লাগসে। ফেইসে আগুন লাগলে যেমন হয় সেরকম হয়ে আছে।
আরেকজন টিচার ফোন দিল – তার স্টুডেন্ট আটকে আছে বাড্ডায় একটা ফ্ল্যাটে। গায়ে অনেক গুলি লাগসে। কী করবে।
এরপর “গুলি লাগসে” শুনলে আগে জিজ্ঞেস করতাম অনেকগুলো না একটা। অনেকগুলো হলে শট গান। একটা হলে 7.62mm রাইফেল বুলেট।
আমরা কখনও টিয়ারশেল, গানশট ইঞ্জুরি ফেইস করি নাই। এগুলার ট্রিটমেন্টও জানা ছিল না। আমার বিশেষজ্ঞ বন্ধুদের ফোন দিচ্ছিলাম। কী করা যায়।
রাতে একজন মহিলা ফোন দিল। কথা শুনে বেশ সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত মনে হল। বললো তার হাজব্যান্ডের মেরুদন্ডে গুলি লাগসে। অনেক ব্লিডিং হচ্ছে। বন্ধ করা যাচ্ছে না।
জিজ্ঞেস করলাম কয়টা গুলি। অনেকগুলা না একটা। মহিলা জানালেন একটা। সেই ফোন কলটা পেয়ে মন খারাপ ছিল অনেকক্ষণ।
এরপর আরেক মহিলা ফোন দিল। তার ছেলের আইসিইউ লাগবে। মাথায় গুলি লাগসে। কোন প্রাইভেট হাসপাতাল নিচ্ছে না। কোথায় নেবে।
সেই ফোন কলটা পেয়েও মন খারাপ ছিল পুরোটা রাত।
এরপর আরেকটা কল মানিকনগর থেকে। শট গানের গুলি। মাথায় বুকে সারা শরীরে। ব্যথা। কী করবে। পোভিসেফ সলিউশন কিনে ক্ষত ড্রেসিং করতে বললাম। বললো – বের হলেই গুলি করতেসে। মানিকনগরের এই গোলাগুলির খবর কোন পত্রিকাতে পাই নাই।
সেই রাতও অনেক অসহায় ফিল করতেসিলাম।
প্রতিটা ফোন আসতেসিলো আর আমার কাছে মনে হইতেসিলো – এই যে বাড্ডায় গুলি খেয়ে আটকে পড়া, স্টুডেন্ট, তার খোঁজ নেওয়া টিচার, এআইইউবির টিয়ার শেল খাওয়া মেয়েটা – এরা একেকজন রিয়েল লাইফ সুপার হিরো। কতটা সৌভাগ্য আমার যে আমি ওদের কিছুটা হলেও কাজে আসতে পারছি।
আমার যতদূর মনে পড়ে পুরো সাত দিনে অন্তত সাঁইত্রিশটা কল পাইসি।
আমি যদি আমার নাম্বারটা না দিতাম, আমি জানতামও না ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও এই অসমসাহসী ছেলেমেয়েগুলোর বিদ্রোহ থেমে যায় নাই।
এরা রাস্তায় নামসে প্রতিদিন। প্রতিদিন মানে প্রতিদিন, প্রতি বেলা।
সেই ২০১৫ সাল থেকে অপরিচিত নাম্বারকে জমের মত ভয় পাওয়া আমি অপরিচত কল আসলেই ধরতাম। মিস করলে কল ব্যাক করতাম, নিজের পরিচয় দিতাম। ব্যস। আর কিছু না। জাস্ট একটা ছোট্ট পরামর্শ দিয়েও যদি কোনভাবে কাজে আসতে পারি।
২০২৪ এর আমার অর্জন এই একটাই। জাস্ট এই একটাই।
ওদের প্রতি এই কৃতজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশের মত না। কোনভাবেই না।




