শহীদ পারভেজ হাওলাদার: মাথায় বিঁধেছিল বুলেট

শহীদ পারভেজ হাওলাদার: মাথায় বিঁধেছিল বুলেট

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’- এই ব্যানারেই ১ জুন থেকে চলছিল সরকারি চাকুরীতে কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন। যা পরবর্তীতে রুপ নেয় এক দফায় বা সরকার পতনের আন্দোলনে। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ৫ ই আগস্ট মাননীয় রাষ্ট্রপতির কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ পত্র জমাদানের মাধ্যমেই পতন ঘটে দীর্ঘ ১৫ বছর শাসন করা স্বৈরাচারী সরকারের।

এই বিজয় এত সহজে আসেনি। এই বিজয় আনতে গিয়ে আহত হয়েছেন প্রায় ২০০০০ এর অধিক। নিহত হয়েছেন প্রায় ২০০০ বীরযোদ্ধা। এদেরই একজন পারভেজ হাওলাদার।

পারভেজ হাওলাদার, বাবা মজিবর হাওলাদার এবং মা হাসি বেগমের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। বাল্যকাল থেকেই ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন তিনি। পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক থাকলেও অর্থাভাবে এইচএসসি দেওয়া হয়নি তার। লেগে পড়েন বাবাকে তার ছোট্ট ব্যবসায় সহায়তা করতে। হঠাৎ বাবা মারা গেলে বৃদ্ধা মায়ের ভার নেন তিনি। পুরোদস্তুর লেগে পড়েন ব্যবসায়। বিনয়ী, স্পষ্টভাষী, পরোপকারী, সাহসী এবং নেতৃত্ব দেয়ার মতো গুনাবলী নিয়েই বড় হয়েছিলেন পারভেজ হাওলাদার। অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদী মনোভাব নিয়ে হাজির হয়ে যেতেন যেকোনো স্থানে। সেই স্পৃহা থেকেই আন্দোলনে যোগদান করেন তিনি।

১৬ ই জুলাই আবু সাঈদ মারা সহ ৬ জন নিহত হন স্বৈরাচার সরকার সমর্থিত গুন্ডাবাহিনী এবং পুলিশের গুলিতে। আন্দোলন ধাবিত হয় চরম পর্যায়ের দিকে। দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এর ডাক দেন ছাত্রনেতারা।

সেই প্রেক্ষিতেই ১৮ই জুলাই বন্ধু শাকিল,তামিমসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নেমে পড়েন পারভেজ হাওলাদার। সাহসের যোগানদাতা হন বড়বোন সেলিনা বেগমসহ পরিবারের সদস্যরা। পুলিশের টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, বুলেট কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। চালিয়ে গিয়েছেন আন্দোলন। ১৮ ই জুলাই থেকে ২১ ই জুলাই পর্যন্ত কমপ্লিট শাটডাউনের প্রতিটি সময় ছিলেন রাজপথে। ২১ ই জুলাই এর পর, শুরু হয় স্বৈরাচারী সরকারের পালিত বাহিনীদের দ্বারা ধরপাকড় অভিযান। চলতে থাকে অনলাইনভিত্তিক নানা কার্যক্রম। যেখানেও সরব ছিলেন পারভেজ হাওলাদার।

অবশেষে ডাক আসে জনগণের কাঙ্ক্ষিত এক দফার অর্থাৎ স্বৈরাচারী সরকার পতনের ডাক। ৩রা আগস্ট শহীদ মিনার অভিমুখে মার্চ, ৪ঠা আগস্ট অসহযোগ আন্দোলন এবং ৫ ই আগস্ট লং মার্চ টু গণভবন। নাস্তা করার কথা বলে বাসা থেকে বেড়িয়ে যান পারভেজ হাওলাদার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মৌচাক এলাকা থেকে সবার সাথে যোগ দেন লং মার্চে। “আল্লাহ তুমি ভালো পরিকল্পনাকারী, আল্লাহ তুমি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের খেয়াল রাইখো। দেশের জন্য দশের জন্য যেইটা ভালো হয় তাই কইরো আল্লাহ। আজকে যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। আমিন” বের হওয়ার পরপরই ক্ষুদে বার্তাটি রেখে যান ফেইসবুক টাইমলাইনে। উদ্দেশ্য গণভবন, বিপত্তি বাধে আন্দোলনের স্টালিনগ্রাদ ক্ষ্যাত যাত্রাবাড়িতে। মুখোমুখি অবস্থান নেয় পুলিশ ও লাখো জনতা। মুহুরমুহু চলতে থাকে টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড। অনেকে ভয়ে পিছিয়ে যেতে থাকলেও একেবারে ফ্রন্টলাইনে অবস্থান নেয় দুঃসাহসী পারভেজ হাওলাদার। যুক্তি একটাই, সবাই পিছিয়ে গেলে আন্দোলন সফল হবে কিভাবে?

 সময় ১২ টা বেজে ২৫ মিনিট, কিছুক্ষনের বিরতির পর আবারো ফায়ার করে পুলিশবাহিনী। এবার টিয়ারশেল নয়, সাউন্ড গ্রেনেড নয়, ছুড়ে দেয় প্রাণঘাতী বুলেট। যা সরাসরি আঘাত করে পারভেজের মাথার পেছনের অংশে। মুহুর্তেই রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে পারভেজ। ধরাধরি করে পাশের একটি ক্লিনিকে নিলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃতদেহটি যখন রিকশায় তোলা হচ্ছিল তখনো মাথা থেকে গড়িয়ে পড়ছিল রক্ত। চারিদিকে ধ্বনিত হচ্ছিল বিপ্লবের স্লোগান। চারিদিকে ধ্বনিত হচ্ছিল ‘আল্লাহু আকবার’।

পারভেজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আবেগী কন্ঠে বলছিলেন বড়বোন সেলিনা বেগম,” পারভেজ ছোট থেইকাই পরিবারের সবাইরে অনেক সম্মান করতো। পরিবারের সব দায়িত্ব নিজেই নিজের ঘাড়ে নিয়া নিতো। বয়সের অনেক তফাৎ হইলেও আমাগো লগে ছিল বন্ধুর মতো সম্পর্ক। প্রথমদিকে আন্দোলনও করছি একলগে। কিন্তু আন্দোলনের শেষদিকে আমাগো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়া মিথ্যা কথা কইয়া একা একা আন্দোলনে যাইতো। সত্য কইয়া গেলে তো আমরা বাঁধা দিতাম না। আমরাও লগে যাইতাম। এই ভয়েই ৫ই আগস্টে মিথ্যা কথা কইয়াই আন্দোলনে যায়। দুপুরের দিকে আমি হুনলাম আমার ভাই গুলি খাইছে। গুলির খবর হুনার পর আমি বিভিন্ন দিকে খোজাখুজি করি। আমার ভাই লাশ হইয়া ফিরবো এইডা আমি ভাবিনাই। এহনো আমার চোখে আমার ভাই ভাসে। ঘরের প্রত্যেকটা জিনিসেই পারভেজ ভাসে।“

পারভেজের মরদেহ দুপুরে তার এলাকায় পৌছায়। বাদ আছর নিমাইকাশারী কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাযা শেষ এ বক্সনগর শুকুরসী কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে। তার পাশেই দাফন করা হয় আন্দোলনে আরেক শহীদ মাহমুদুল হাসান জয়কে।

পারভেজ, ইরফান, আবু সাঈদ, মুগ্ধদের এই ত্যাগের মাধ্যমেই জাতি পুনরায় অর্জন করলো স্বাধীনতা। পারভেজের আত্মত্যাগে কোনো অনুশোচনা নেই পরিবারের। বিভিন্ন দিক থেকে আর্থিক সহযোগিতা আসলেও তাদের কোনো আর্থিক সহযোগিতার দাবী নেই। তাদের দাবী একটাই। পারভেজ এর এই আত্মত্যাগ যেন মনে রাখে এই দেশের মানুষ।

ছবিতে শহীদ পারভেজ হাওলাদার:

লেখাটি তৈরী করেছেন- রাইসুল ইসলাম রিফাত, একটিভিস্ট, নারায়ণগঞ্জ

Loading

Scroll to Top