
ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় সাঁচরা ইউনিয়নের দেউলা গ্রামের অভাবী পরিবারের সহজ সরল মেয়ে লিজা আক্তার। তার পিতা দরিদ্র জয়নাল শিকদার। ছোটবেলা থেকে অভাব অনটনের মাঝেই বড় হন লিজা আক্তার। পেটে দুইবেলা খাবার না পেলে তো আর মেট্রোরেল চিবিয়ে খাওয়া যায় না। আবার লিজা আক্তার অভাবের তাড়নায় পড়াশোনা করতে পারেনি বিধায় কখনো কবি রফিক আজাদের মত বলতেও পারেনি, ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র চিবিয়ে খাবো। তাই ক্ষুধা নিবারণের জন্য লিজা আক্তার পাড়ি জমান ঢাকায়।
রাজধানী ঢাকার শান্তিনগরের একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ নেয় লিজা আক্তার। বেশ ভালো ছিলো ওই বাসার মানুষজন। লিজার কাজে সবাইই বেশ সন্তুষ্ট। লিজাও জীবনযুদ্ধে দুইবেলা খেতে পেরে এবং পরিবারের জন্য কিছু উপার্জন করতে পেরে বেশ সন্তুষ্ট। কিন্তু গরীবের সুখ ক্ষণস্থায়ী। দেশে বিপ্লব, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের হাওয়া বইছে তখন। ১৬ বছরের নিপীড়নের পরে জনগন ছাত্রদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ করতে আবারো শিখেছে। আর অন্যদিকে অবৈধ ক্ষমতা অন্যায়ভাবে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে স্বৈরাচাররা ঢালাওভাবে খুন, আটক, হামলা চলমান রেখেছে।
এমনই একদিন ১৮ জুলাই ২০২৪। জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগে পুরো জাতি তখন গর্জে উঠেছে। তেমনিভাবে সেদিন, রমনা থানাধীন এলাকায় ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ শুরু করে। ছাত্রদের একটা অংশ শান্তিনগরেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এবং সেই সময়ে ছাত্রদেও মিছিলকে উদ্দেশ্য করে পুলিশ, সন্ত্রাসী লীগ সহ স্বৈরাচারের দোসর রা হামলা চালায়।
১৯ বছর বয়সী মোসাম্মৎ লিজা আক্তার তখন শান্তিনগরের ১২ তলা ভবনের সাততলায় যে বাসায় কাজ করতেন সেখানে অবস্থান করছিলেন। ওইদিন অর্থাৎ ১৮ জুলাই দুপুর আনুমানিক তিনটার দিকে লিজা বাইরে হৈচৈ ও অনেক শব্দ শুনে সাততলার ও বাসার বারান্দার সামনে গিয়ে দাঁড়ান কি হচ্ছে তা দেখার জন্য। হঠাৎ একটা গুলি এসে লিজা আক্তারের পেটে লাগে। লিজা আক্তার একটা চিৎকার করে ওই বারান্দাতেই পড়ে যান।
বারান্দা থেকে অমন প্রচন্ড শব্দ শুনতে পেয়ে দৌড়ে আসে ওই বাসার সদস্যরা। এসে দেখেন লিজা বারান্দায় পড়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। আর চারপাশে শুধু রক্ত। তারা দেরী না করে সাথে সাথে লিজাকে নিয়ে ভর্তি করান অরোরা স্পেশালাইজড হাসপাতালে। সেখানে লিজাকে নিয়ে গেলে বুঝতে পারা যায় গুলিটি লিজার পেটে ঢুকে একেবারে পিঠ ভেদ করে বেড়িয়ে গেছে।
অরোরা হাসপাতাল থেকে কোনোরকমভাবে প্রাথমিক চিৎিসা নেয়া হয়। এরপরেই লিজাকে নিয়ে ভর্তি করা হয় পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সেখানে চিকিৎসা শুরু করা হয় লিজা আক্তারের। লিজা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যায় ৪ দিন। এরপর ২২ জুলাই ২০২৪ তারিখে শাহাদাত বরণ করেন আজীবন জীবনের সাথে যুদ্ধ করা বীরকন্যা মোসাম্মৎ লিজা আক্তার।
লিজা আক্তারের বাবা মোঃ জয়নাল শিকদার পরবর্তীতে বাদী হয়ে একটা মামলা করেন। কিন্তু তাদের পরিবারের কেউই জানে না যে লিজা আক্তার ন্যায়বিচার পাবে কি না। লিজার বড়বোন সালমা আক্তার অনেক আক্ষেপ নিয়ে বলেন, বিচার চাই না কারো কাছে। বিচার চাইয়া কি হইবো? নিজের বোন ডা রে কি আর ফেরত পামু?
যে পেটে দুইবেলা খাবারের আশায় জীবনসংগ্রাম লিজা আক্তারকে ঢাকা নিয়ে আসলো, স্বৈরাচার রা সেই পেটে অন্ন এর বদলে গেঁথে দিলো বুলেট। অথচ যেদিন লিজা আক্তার গুলিবিদ্ধ হলেন সেদিন স্বৈরাচার মেট্রোরেল এর জন্য কাঁদলো, ভবনের জন্য কাঁদলো কিন্তু শহীদ লিজা আক্তার এর কথা একবার বললো না।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লিখেছেন: সৌমিক ফারুকী; এক্টিভিস্ট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার ও মিউজিশিয়ান
![]()




