শহীদ জাবির ইব্রাহীম: বিজয় মিছিলে গু লি বি দ্ধ শিশু

জাবির ইব্রাহিম, বয়স ৬ বছর। মা-বাবার সঙ্গে রাজধানীর দক্ষিণখান থানার পশ্চিম মোল্লারটেকে থাকত সে। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে পড়ত। ছয় মাস আগে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল জাবির। দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে জাবির সবার ছোট। বাবা কবির হোসেন রাজধানীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের খবরে সারাদেশে বিজয় মিছিল শুরু হয়। সেই বিজয়োল্লাসে যোগ দিতে বাবা মায়ের সাথে জেদ ধরে জাবির। মা রোকেয়া বেগম শুরুতে চাননি যে জাবির মিছিল দেখতে যাক। তিনি জাবিরকে বাসায় দাদার কাছে রেখে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাবিরের জেদ সে যেতে চায়, সে বিজয় মিছিল দেখবে। অবশে্ষে, বাধ্য হয়ে রোকেয়া বেগম জাবিরকে নিয়ে যান উত্তরার জসীমউদ্দীন সড়কে। সেদিন হাজারো জনতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাবির ও স্লোগান দিচ্ছিলো ,তার চোখেমুখে ছিল বিজয়ের আনন্দ। একপর্যায়ে জাবিরকে নিয়ে বাসায় ফিরে যেতে চাইলে আরও কিছুক্ষণ থাকার বায়না করে সে। মা-বাবার হাত ধরে জাবির মিছিল দেখছিল, তখন হঠাৎ শুরু হলো গোলাগুলি। বিজয় উল্লাসের মাঝেই পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ শুরু হয়। উত্তরা পূর্ব থানা থেকে এলোপাতাড়ি বুলেট ছোড়া হয় ছাত্র জনতার উদ্দেশ্যে। মুহুর্তেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে,মানুষ গোলাগুলির আওয়াজে দৌড়ে পালানো শুরু করে। বাবার ডান হাত ধরে জাবির দৌড়াতে থাকে এবং এক পর্যায়ে জাবির আহ করে আর্তনাদ করে উঠে ,জাবির এর বাবা তাকিয়ে দেখে ছেলের উরুতে গুলি লেগে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে শরীর ভিজে যাচ্ছে। জাবির এর মা পেছন থেকে দৌড়ে এসে দেখে ছেলে রাস্তায় পড়ে আছে, রক্তে প্যান্টসহ শরীর ভেসে যাচ্ছে। রক্তাক্ত সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করেন জাবির এর বাবা । জাবিরকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় কাছের একটি হাসপাতালে। রক্ত দেওয়া প্রয়োজন হলেও সেখানে রক্তের ক্রস ম্যাচের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য জাবিরকে দ্রুত উত্তরার আরেকটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতে জাবিরের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। জাবিরের খিঁচুনি শুরু হলে, মা কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলতে থাকেন, “বাবা, চোখ বন্ধ করো না, চোখ খোলা রাখো বাবা!” কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলো। শেষে আরেকটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে, হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরে দেড় ঘন্টা রক্তক্ষরণে মারা যায় জাবির নামের ছোট্ট শিশুটি। হাসপাতালে জাবিরের মৃত্যুর কারণ লেখা হয়েছে ‘ব্রট ডেড’, অর্থাৎ মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। আগের হাসপাতালটিতে জাবিরের আহত হওয়ার কারণ লেখা হয়, ‘বুলেট ইনজুরি অন থাই’।
গুলিতে নিহত জাবিরের মা রোকেয়া বেগম জানান জাবিরের বাবার কষ্ট বেশি, কারণ মৃত্যুর আগে জাবির তাঁর হাতেই ছিল, কিন্তু ছেলেকে বাঁচানোর জন্য তিনি কিছুই করতে পারেননি। প্রতিটি মুহূর্তে বাবা-মায়ের মনে পড়ে ছেলের স্মৃতি। সকাল হলে জাবির বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরত, জিজ্ঞেস করত, “মা, তুমি এত সকালে কেনো উঠো?”। রুম ভর্তি বই খাতা,খেলনা গুলো যেন জাবির এর অপেক্ষা করছে। । সাইকেলটা যেন অপেক্ষা করছে এই বুঝি জাবির ফিরে এসে আবার ঘর জুড়ে খেলে বেড়াবে। কিন্তু জাবির আর কখনো ফিরে আসবেনা।
চব্বিশে নতুন করে বিজয় এসেছে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার সময় এসেছে কিন্তু এই নতুন বাংলাদেশে জাবির নেই ।সবার আদরের সেই ছোট্ট জাবির আর কখনো বাবা মায়ের কাছে মিছিলে নিয়ে যাওয়ার বায়না করবেনা। চব্বিশের এই বিজয়ে জাবির এর বাবা মা ফিরেছে শূন্য হাতে। তাদের চোখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন—”কেন, কেন আমাদের এই ছোট্ট সন্তানকে এভাবে হারাতে হলো?” তবুও, ছেলের মৃত্যুর বিনিময়ে তারা চান একটি নিরাপদ বাংলাদেশ, যেখানে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না, আর কোনো শিশু গুলিতে প্রাণ হারাবে না। জাবির এর মা রোকেয়া বেগম বলেন “ আমি কোনো দলের না ,আমি একজন মা, আমি মা হয়ে প্রতিটি সন্তান হত্যার বিচার চাই”।

শিশু শ্রেণীর শিক্ষার্থী জাবির। সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুলাই আর্কাইভের জন্য এটি লিখেছেন: তাবাসসুম নেওয়াজ ঊর্মী; শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Loading

Scroll to Top