

৪ বছরের ছোট্ট শিশু আব্দুল আহাদ। বাবা আবুল হাসান, মা সুমি আক্তার আর বড় ভাই দিহানের সাথে থাকত রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকায়। বাসার সবার ছোট আর আদরের আহাদের দিন কাটত কখনো তার প্রিয় খেলনা মোটরসাইকেলে চড়ে, কখনো ছড়া আবৃত্তি করে, দুস্টুমিতে আর মায়ের সাথে খুনসুটিতে আর কখনো বা ছুটির দিনগুলোতে পরিবারের সাথে থিম পার্কে ঘুরে। ১৯ জুলাই,শুক্রবার, দুপুরের কিছু আগে, আহাদ বাসার বারান্দায় বসে ছিল। হঠাৎ বাসার সামনের রাস্তায় হৈচৈ শুরু হলে আহাদ বাবাকে ডাকল কি হচ্ছে দেখার জন্য। কিছুক্ষণ পর আহাদের মাও বারান্দায় এসে যোগ দিল। এক পাশে বাবা, আরেক পাশে মা, মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট আবদুল আহাদ। বাসার বারান্দায় দাঁড়ানো তিন জোড়া চোখ নিচের দিকে তাকিয়ে। বাসার নিচে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ চলছে। আচমকা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আহাদ।
বাবা ভেবেছিলেন ছেলে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। ছেলেকে ধরে তুলতে গিয়ে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় আবুল হাসানের।
ছেলেটার চোখ, মুখ, মাথা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। গুলিটা ডান চোখে বিদ্ধ হয়ে মাথার ভেতরেই আটকে গেছে। মা চিৎকার করে উঠলেন। ততক্ষণে মেঝেতে রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। আহাদকে কোলে নিয়ে বাবা দৌড়ে লিফটে করে বাসার নিচে নেমে রিক্সা খুঁজতে লাগলেন। ততক্ষণে রাস্তায় সংঘর্ষ থেমে গেছে। পথচারীদের সহায়তায় একটা রিকশা ঠিক করে ছুটে চললেন হাসপাতালের দিকে। সারাটা পথ জুড়ে আহাদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাবা কাদছিলেন আর দোয়া করছিলেন। পথে পুলিশ বাধা দিলে অনেক অনুরোধ করে সেই বাধা পার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলেন। তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা বলেন, গুলি মাথার মধ্যে আছে। কিন্তু কোন অবস্থানে আছে, তা বোঝার জন্য সিটিস্ক্যান করতে হবে। কিন্তু সিটিস্ক্যান করতে নেওয়া হলে আইসিইউর যন্ত্রপাতি খুলে ফেলতে হবে। এতে শিশুটির মৃত্যুও হতে পারে। তবে সিটিস্ক্যান করাও জরুরি। পরের দিন শনিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আহাদকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার বেলা তিনটার দিকে আহাদের মরদেহটি তাঁরা বুঝে পান। তারপর অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গ্রামের বাড়ি ভাঙ্গার পুখুরিয়া গ্রামে চলে যান। বাদ মাগরিব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় আহাদকে। ‘বাড়িতে আগে পারিবারিক কবরস্থান ছিল না। আহাদকে দাফনের মধ্য দিয়েই কবরস্থানটির যাত্রা শুরু হলো,’ আবেগভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলেন আহাদের চাচা মোকলেসুর রহমান।
বাংলাদেশি নিউজ চ্যানেল আরটিভিতে সেদিন ওই এলাকায় তোলা মোবাইল ফুটেজে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সমর্থক ওই হামলাকারীদের অন্তত একজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
ছোট্ট আহাদকে হারিয়ে আজ গভীর শোকে পাথর হয়ে আছে বাবা-মা আর পরিবার। আহাদের ব্লগিং পেজ Dihan & Abdul Ahad Two Brothers এ এখনও রয়ে গেছে আহাদের সব সুন্দর সুন্দর স্মৃতি।কথা ছিল আহাদ ধীরে ধীরে আরও বড় হবে, আর তার সাথে সাথে চমৎকার আরও কত শত আনন্দময় মুহুর্তগুলো বন্দী হবে বাবা মায়ের ক্যামেরায়। অথচ এই ৪ বছর বয়সেই আজ চিরনিদ্রায় শায়িত আছে কোটা সংস্কার ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত শহীদ আব্দুল আহাদ। আহাদের প্রিয় খেলনা, তার ছোট ছোট গাড়িগুলো, মোটরসাইকেল, জিপ, রোবট গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা ঘরময়। আহাদের স্মৃতি হিসাবে খেলনাগুলো সেভাবেই রেখে দিয়েছে তার পরিবার। “আমার সন্তান নিজের ঘরেও নিরাপদ ছিল না।” কান্নাজড়ানো কন্ঠে বললেন বাবা আবুল হাসান। “আব্দুল আহাদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার দিন সকালেও আমার বুকের ভিতর এসে বলছিল, বাবা তোমার বুকের ভিতর থাকতে আমার অনেক ভালো লাগে, আমাকে রেখে তুমি কোথাও যাবা না, তোমার সাথে আমাকে অফিসে নিয়ে যাবা। আজ আমার আব্দুল আহাদ আমাকে একা রেখে নিজেই চলে গেলো চিরনিদ্রায়….একটা নিষ্পাপ শিশুকে কেন মরতে হল? আমি একজন সরকারি চাকরিজীবি। আমার দাদা একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার সন্তান নিষ্পাপ ছিল।….আমি আমার আব্দুল আহাদের হত্যাকারীদের বিচার চাই”।
Writer: Chowdhury Linia Nazmi, Scientist, Scientist, Maryland, USA, USA
![]()




