১৫ই জুলাই: ষোলশহরের লাল প্রতিরোধের দিন

জুলাইয়ের ১৫ তারিখ জীবনের অন্যতম একটা সেরা দিন হিশেবে স্মৃতিতে থেকে যাবে। – আজাদ হোসেন

১৫ তারিখে আমি, আরিফ, ইমন, আব্দুল্লাহ, শওকত যখন বাসা থেকে বের হচ্ছিলাম তখনই মাইন্ড সেট করে বের হইছিলাম ছাত্রলীগ হামলা করতে আসলেই প্রতিহত করবো। সেজন্য সবাইকে বলতেছিলাম কেডস/জুতা পরে বের হতে।

ষোলশহর গিয়ে দেখি আন্দোলনকারীরা মাইক ছাড়া খালি গলায় স্লোগান দিচ্ছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আড়াইটার ট্রেন আসার কথা ছিল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সেই ট্রেন আটকে দেয়। শহরের বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীরা বলা যায় মোটামুটি নেতৃত্বশূন্য। তারা খালি গলায় স্লোগান দিতে গিয়ে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁপিয়ে উঠছেন। চিন্তা করলাম মাইকের ব্যবস্থা করা লাগবে। রুমী ভাই আর শিমুল ভাইকে ফোন দিলাম, তারা বললেন তোমরা মাইকের ব্যবস্থা করো টাকা আমরা দিব।

পরে জমির ভাই আমাকে বললো, চলো বিকাশ থেকে ৫০০ টাকা তুলে দিচ্ছি। আমি সহ ভাইয়ের সাথে গিয়ে ৫০০ টাকা তুললাম। আরিফ, ইমন সহ অন্যান্য ভাই-ব্রাদাদের থেকে ৫০/১০০ টাকা দিয়ে আবিদ আর এনামকে পাঠালাম মাইকের জন্য।

মাইকের জন্য অপেক্ষা করছি। স্টেশনে ঢোকার মুখে পুলিশের নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারছিলাম ছাত্রলীগ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাইক এসে পৌছানোর আগেই আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই তারা হামলা করবে। মহানগর ছাত্রলীগের কয়েকজনকে ঘুরেও যেতে দেখলাম। ওদিকে এনামের মাইক নিয়ে আসতে দেরি হচ্ছে দেখে টেনশনও হচ্ছিলো। আরিফ আবিদকে ফোন দিয়ে বকাবকি করছে বারবার। আমরা মেইন রোড থেকে একবার ব্রিজের উপর উঠতেছি আবার মেইন রোডে নামতেছি। আর পুলিশের যারা ছিলেন তারা বারবার চাচ্ছেন আমাদের স্টেশনে ঢুকাতে।

শেষমেশ, এনাম মাইক নিয়ে পৌছায়। আমরা কয়েকজন ধরে রিকশাটা প্লাটফর্মের উপর তুলে ফেলি। তারপর ইমন বক্তব্য দেয় ৪/৫ মিনিটের মতো। ইমন বক্তব্য দেওয়ার আগে আমরা তাকে বলছিলাম তার বক্তব্যে ছাত্রলীগ হামলা করতে পারে এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করতে।

আমি একথা আগেও বলেছি, ইমনের মধ্যে সভা সমাবেশে মানুষের পালস বুঝে বক্তব্য দিয়ে তাকে ভেতর থেকে ক্ষেপিয়ে তোলার অসম্ভব ক্ষমতা আছে।
সে তার বক্তব্যে বলে, আপনাদের প্রত্যেকের সামনে একটা করে কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে, এই প্রস্তুত কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে দীর্ঘায়িত করা যায় না। এবং নিশ্চয়ই জেনে রাখবেন যে, না বলা কথা মৃত্যুত্তোর স্মরণ সভায় নিজের হয়ে আর বলা যায় না।

ছাত্রলীগ যে যেকোনো সময় হামলা করতে পারে সেটা বলে সে সবাইকে সতর্ক করে। ছাত্রলীগ হামলা করতে আসলে সবাইকে প্রতিহত করার আহবান জানায়; আন্দোলনকারীরা তার কথায় সায় দেয়। ইমনের এই বক্তব্য স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে, সবাই খুব উজ্জীবিত হয়।

ইমনের বক্তব্যের পর রাসেল স্পিকার হাতে নেয়। সে কথা বলা শুরু করার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাত্রলীগ হামলা করতে এগিয়ে আসে।

আমি, ইমন, আরিফ, জহির আটারো সাল থেকে রাজপথে আন্দোলনে থাকা মানুষ। আমরা যখনই একত্রে কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি তখনই আমাদের মধ্যে অব্যক্ত প্ল্যান করা থাকতো। কে বক্তব্য দিবে, কে যোগাযোগ মেনটেইন করবে, কে সভা সমাবেশে নিরাপত্তার বিষয় দেখবে এগুলো আমরা কথা না বলেও নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিতে পারতাম।

আমি সবসময়ই আমাদের উপর যাতে হামলা না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার দায়িত্বে থাকতাম। ১৫ তারিখেও একই দায়িত্ব। ইমন বক্তব্য দেয়া শুরু করলে আমি প্লাটফর্মে ইমনের বিপরীত মুখো হয়ে দাড়িয়ে মেইন রোডের দিকে নজর রাখছিলাম। আমার পেছনেই রিকশার মধ্যে মাইক, আর মাইকের সামনে ইমন আর রাসেল বক্তব্য দিচ্ছে।

রাসেল বক্তব্য শুরু করার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাত্রলীগ হামলা করতে এগিয়ে আসে। তারা যখন মেইন রোড থেকে ব্রিজের উপর উঠতেছে তখনই তারা আমাদের নজরে পড়ে।
আমি কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করেই প্লাটফর্ম থেকে রেললাইনের মধ্যে নেমে যাই। আমার সাথে সাথে আরও ৪/৫ জন নামে। আমরা রেললাইনের পাথর নিয়ে ছাত্রলীগের গুণ্ডাদের দিকে ছুড়তে থাকি।

ছাত্রলীগ হামলা করতেছে এটা বুঝে আন্দোলনকারীদের বেশিরভাগই কেউ রেললাইন ধরে পূর্ব দিকে আর কেউ পশ্চিম দিকে দৌড় দেয়, একটা হুড়োহুড়ি তৈরি হয়ে যায়। আমরা অল্প কয়জন মানুষ স্টেশনের পাথর ছুড়ে এদেরকে থামাই দেই। ছাত্রলীগ এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না, তারা ভড়কে যায়। তারাও পাল্টা ইট পাথর ছুড়তে থাকে। আমার পাশেই এক ভাইয়ের কপালে তাদের ছোড়া পাথর লেগে কপাল ফেটে দরদর করে রক্ত ছুটে। কেউ একজন তার কপাল চেপে ধরে তাকে একপাশে নিয়ে যায়। আমরা ফাইট করে যাচ্ছি দেখে দেখে যারা দৌড়াচ্ছিল তারা আবার আমাদের সাথে এসে যোগ দেয়।

বড় সংখ্যক মানুষ এসে আমাদের সাথে যোগ দিলে আমরা ছাত্রলীগকে পাল্টা ধাওয়া দেই। এই ধাওয়া দেওয়ার মুহুর্তটা জীবনের অন্যতম সেরা একটা মুহূর্ত হিশেবে থেকে যাবে।

সেই মুহুর্ত পানি ঢেলে দেয় শহুরে মুরগি আর আপুদের ছোড়া পাথর।
আমরা যে কজন সামনের দিকে দৌড়াই গিয়ে ছাত্রলীগকে ধাওয়া দিচ্ছিলাম তারা পেছনে থেকে আমাদের মানুষের ছোড়া পাথরই খাইলাম। ইনাদের আসলে শক্তিতে কুলোচ্ছিল না। ছাত্রলীগকে ছোড়া ঢিল তাই আমাদের গায়ে লাগতেছিল।

এরপর ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলেছে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের পাশের রাস্তা দিয়ে এক গ্রুপকে দৌড়ানি দিয়ে নাসিরাবাদ হাউজিংয়ে ঢুকাই দিয়ে বের হয়ে আসলাম। ইশতিয়াক সম্রাট বললো, ভাই সামনে ব্যারিকেড দিতে হবে। সম্রাট যে আমার ডিপার্টমেন্টের তা আমি তখনও জানতাম না।পরে কথা বলে জানলাম।
সামনে আগাই গিয়ে দেখি নোবেল ভাই পোলাপানকে নিয়ে শপিংয়ের সামনে ব্যারিকেড দিচ্ছেন। ভাই আমাকে বললো, বেশি করে পোলাপান আর ইট নিয়ে আসো, এখানে জড়ো করো।

ছাত্রলীগকে দাবড়ানি দিয়ে আমরা বুঝছিলাম আমরা ওদের ক্ষেপিয়ে দিয়েছি। সন্ধ্যা নামতেই তারা হামলা করার আশঙ্কা। আরিফকে বললাম সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আমাদের সরে পড়তে হবে। পরে মিছিল নিয়ে মুরাদপুর পর্যন্ত গিয়ে ঐদিনের কর্মসূচি শেষ হয়।

এরপর আগস্টের ৩ তারিখ বাদে বাকি প্রত্যেকদিন হয় পুলিশ নাহয় ছাত্রলীগের দাবড়ানি খেয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছে। কিন্তু আমরা হার মানি নাই।

আওয়ামী জাহেলিয়াতে আমরা খালি পিটা খেয়েই গেছিলাম, কখনো প্রতিহত, পাল্টা আক্রমণ করতে পারি নাই। ১৫ ই জুলাই ষোলশহরে আমরা প্রথম ছাত্রলীগকে প্রতিহত করি। পরে সারাদেশ তাদের প্রতিহত করতে উদ্ধত হয়। সেদিন আমরা কি পরিমাণ খুশি হইছিলাম সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। দুনিয়ার সকল জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই এবং ষোলশহর আমাদের অনুপ্রেরণা হিশেবে থাকুক।

একাত্তরের মতো জুলাইয়ের অঙ্গীকারও আমাদের চির জাগরূক থাকুক।

Inqilab Zindabad
Long live Red July

(১৫ জুলাইয়ের এই ছবিটা আরিফ আর ইমন খুঁজে বের করছে)

আজাদ হোসেন, পাঠচক্র ও রাজনৈতিক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা

Loading

Scroll to Top