ফেসবুক পোস্টে আন্দোলন আপডেট। ঢাবি ও ঢাকা। তুহিন খান

জুলাই ১৭, রাত সাড়ে ১২টা

বলছিলাম যে, এই আন্দোলন দমন করতে গেলে রেজিমের খাতায় এমন এক কালো দাগ লাগবে, যা সাফ করা অসম্ভব। তাই হইছে। সারাদেশে আজ যে ছাত্রঅভ্যুত্থান ঘটে গেল, দেশের প্রত্যেকটা সেক্টরে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। দেশের সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা আজ একযোগে এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নিজেদের নৈতিক অবস্থান জানায়ে দিছে। এটাকে এই আন্দোলনের নৈতিক বিজয় বলা চলে। 

জাবি, রাবি, বিএম কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রলীগকে উচ্ছেদ করছে শিক্ষার্থীরা। এই প্রতিষ্ঠানগুলা আজ যে ইতিহাস গড়ছে, তা তুলনাহীন। চট্টগ্রাম, বেরোবি আর ঢাকা কলেজে আজ শহিদ হয়ে গেছে ৭ জন। আবু সাঈদ গুলির সামনে বুক পেতে দিছে। একটা গুলি খাইছে, তবু সরে নাই। একটু দম নিয়ে আবার বুক পাতছে। ওরা আবার গুলি করছে! আহারে ভাই আমার!

কিন্তু এই রক্তের উপর দাঁড়ায়ে আমরা এখন কী করব? আজ ঢাবিতে আমার ছোটভাই Abdullah Shaleheen Oyon গুলিবিদ্ধ হইছে৷ শহিদ মিনারে আজ বিপুল জমায়েত সত্ত্বেও আমরা কিছু করতে পারি নাই। আমাদের জমায়েত সমন্বিত ছিল না। স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না। অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায়ে পড়ছে। মাথার উপরে উড়তেছিল ড্রোন আর হেলিকপ্টার। ছাত্রলীগের ভয় আমাদের ছিল না; কিন্তু পুলিশ আর বিজিবির মহড়া দেইখা আমরা লাশের সংখ্যা বাড়াইতে চাই নাই। এটা আমাদের সামগ্রিক ভুল ছিল। আমরা আজ রাজুতে যাইতে পারি নাই। এতে অনেকেই রুষ্ট। 

কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে, ঢাবি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মত না। ঢাবি দখলে রাখতে সরকার যা না তা করতে প্রস্তুত। সেই প্রস্তুতির নজির আজ দেখছি আমরা। টিএসসিতে আজ সারাদিন নেট অফ ছিল। জাবিতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সাথে ছিল, আমাদের সাথে কেউ ছিল না। তবু আমরা যদি আজ কোনোভাবে হল চত্বর ঘুইরা আইসা রাজুতে দাঁড়াইতে পারতাম, হয়ত লাভ হইত। কিন্তু আমরা পারি নাই। 

তবে এই না পারাতে থেমে গেলে হবে না। সারাদেশে আমার ভাইবোনদের প্রাণ ঝরছে। রক্তে ভেসে গেছে রাজপথ। ওরা ‘রাজাকার’ নামের এক কল্পিত দানব খাড়া কইরা একটা গণহত্যার আয়োজন সাজাইছে। এই দানবদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চালায়ে যাইতেই হবে। 

সারাদেশের সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ দিছে, দিক। তাতে কিছু এসে যায় না। শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ থাকেন। আপাতত নিজেদের সার্কেলে ছাত্রলীগরে বয়কট করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লাশ সবখানে ওদের বয়কট করেন। হলগুলাতে নিজেরা সংগঠিত থাকেন। যে হলগুলায় ওরা দুর্বল, সেখানে ভেতরে ভেতরে ওদের আরো দুর্বল করে তোলেন। 

শিক্ষকরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান। ওদের মিছিলে শরিক হোন। জাবির শিক্ষকদের পথ অনুসরণ করেন। আমরা আপনাদের সন্তান। আমাদের হাত ছেড়ে দিয়েন না। সমন্বয়করা এখন একটু থেমে বসেন। ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে সিদ্ধান্ত নেন। সমন্বয়ক প্যানেলের ক্ষতিকর এলিমেন্টগুলারে মেরামত করেন। ছাত্র সংগঠনগুলার সাথে সমন্বয় করেন। পুরা ছাত্রসমাজ আপনাদের দিকে তাকায়ে আছে। ওদের একটা হোপ দেন প্লিজ। কাল শিক্ষকদের প্রোগ্রাম আছে ঢাবিতে। সেই প্রোগ্রামে আমরাও দাঁড়াইতে পারি। জড়ো হইতে পারি। আরো অনেক কিছুই হয়ত পারি। এই পারাপারির প্রধান একটা শর্ত জমায়েত। যত বড় মিছিল হবে, ওদের বুকে তত কাঁপন ধরবে৷ ফলে আপনারা নিরাশ হইয়েন না। উজ্জীবিত থাকেন। 

কাল আশুরা। দেশ কার্যত অচল। সারা বাঙলাদেশ এখন কারবালার ময়দান। কারবালা কী শিখায়? ত্যাগ আর প্রতিরোধ। সারাদেশে আমাদের ভাইবোনেরা আজ তাই করছে। অনেকে বোঝেন না যে, কারবালার ময়দানেই আশলে এজিদের পতন শুরু হইছিল। আমরা হয়ত সাময়িকভাবে কোনঠাসা এখন, কিন্তু মোটেই পরাজিত না। আমরা কারবালার প্রান্তরে দাঁড়ায়ে থাকা হোসাইনি কাফেলা। হোসাইনি কাফেলা কখনো হারে না।

হলমুক্তির ঘটনাপঞ্জি

রাত ২টা ৩৫

এই মুহুর্তে ছাত্রলীগমুক্ত ঢাবির ৬টি হল:

শহীদুল্লাহ হল‌

ফজলুল হক মুসলিম হল

অমর একুশে হল

রোকেয়া হল

মহসীন হল

কুয়েত মৈত্রী হল

রাত ২টা ৪৫

সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মিছিল চলছে। জেগে ওঠো বন্ধুগণ, বিজয় আসবেই!

৩টা ১৩

শামসুন্নাহার ডান। লিখিতভাবে রাজনীতিমুক্ত। বঙ্গমাতায় অ্যাপ্লিকেশন লিখতেছে বাঘিনীরা।

৩টা ৫১

মেয়েদের ৫ টা হলই লিখিতভাবে ছাত্রলীগমুক্ত।

সকাল ১১টা

ইয়েস। আমার প্রিয় সূর্যসেনেও খেলা জমে গেছে। ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি শয়নের রুম ভেঙে চুরমার করছে সূর্যসেনের সূর্য সন্তানরা। ভাঙচুর চলতেছে বিজয় একাত্তরেও। এখন পর্যন্ত সন্ত্রাসমুক্ত হল:

১. জহু হল

২. একুশে হল

৩. শহীদুল্লাহ হল

৪. এফ এইচ হল

৫. মুহসীন হল

৬. রোকেয়া হল

৭. শামসুন নাহার হল

৮. কুয়েত-মৈত্রী হল

৯. ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল

১০. সুফিয়া কামাল হল

১১. বঙ্গবন্ধু হল

১২. জিয়া হল

১৩. সূর্যসেন হল

১৪. বিজয় একাত্তর হল

১৫. জসীমউদ্দিন হল

১৬. সলিমুল্লাহ হল

১৭. এফ রহমান হল

সকাল সোয়া ১১টা

এই মুহূর্তে কেউ হল ছাড়বেন না। প্রত্যেকটা হলে শক্ত অবস্থান নেন। নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ক টিম তৈরি কইরা হলগুলারে দখলে রাখেন। প্রত্যেকটা হলে লিখিত স্মারকপত্র তৈরি করেন। সেখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণ, হল সংসদ নির্বাচন, হলের লিগাল সিটের আবেদন, বহিরাগত নিষিদ্ধকরণসহ বেসিক দাবিগুলা লেইখা প্রভোস্টদের সাইন নেন। ঐক্যবদ্ধ থাকেন। পুলিশ-বিজিবি হলে হলে ঢুইকা হামলা করবে? করুক। মাখুক ওরা এই কলঙ্ক গায়ে। তাতে ওদেরই লস। 

আশপাশে বিভিন্ন হলের যারা বাইরে থাকেন, নিজ নিজ হলে যান। স্বাধীন হলগুলাতে গিয়ে বুকভরে দম নেন। জুনিয়রদের সাথে মিলে সেলিব্রেট করেন আজকের দিন। আজকের দিনটা সেলিব্রেশনের। 

প্রথম যেদিন সূর্যসেন হলে আইসা লিগাল সিটের জন্য আলাপ করি কর্মচারীদের সাথে, তারা আমার দিকে তাকায়া মুচকি হাসছিল। বলছিল, বাইরে থাকেন, সেইটাই ভালো। লিগাল সিট বলতে কিছু নাই। আজ আর সে পরিস্থিতি নাই। আজ আমার হল সন্ত্রাসমুক্ত।

সূর্যসেনে যাব আজ। আমার হলে। অনেক দিন পরে। বুক ভইরা দম নেব মাঠটাতে। সাথে কারা কারা যাবেন? কমেন্টে হাত তোলেন।

বিকেল ৩টা 

ক্যাম্পাসে এই মুহূর্তে র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবি অবস্থান নিয়া আছে৷ প্রত্যেকটা পয়েন্ট তারা ব্যারিকেড দিয়ে রাখছে। তারা রাজুতে সাউন্ড গ্রেনেড ফোটাচ্ছে। আমরা নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমাবেশে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের নিয়া ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নিছি। শিক্ষকদের সাথে আমরা কথা বলছি। তারা আমাদের সাথে সংহতি জানাইছে৷ তারা ভিসির সাথে আলাপের জন্য তার বাসভবনে গেছিল, কিন্তু তাকে নাকি পায় নাই। 

এই মুহূর্তে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবি জানাইছে শিক্ষার্থীরা৷ হলে শিক্ষার্থীদের অবস্থান করতে দিতে হবে। ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব প্রত্যাহার করতে হবে৷ হলে হলে শিক্ষার্থীরা আটকা পড়ে আছে। অসংখ্য মেয়ে আছে৷ রোকেয়া হলের সামনে ওরা সাউন্ড গ্রেনেড মারতেছে৷ নেট বন্ধ করে রাখছে গোটা এরিয়ায়। আজ যদি ঢাবিতে ক্র‍্যাকডাউন হয়, আমাদের বোনদের রক্ত ঝরে, তাহলে জাতি এদের ক্ষমা করবে না৷ 

জুলাই ১৮, রাত ২টা ৩৪

১৭ জুলাই, ঢাবির কালো দিবস

সারাদিন অনেকে নানা বিষয়ে ফোন দিছেন, নক করছেন। ধরতে পারি নাই। নেটওয়ার্ক বা নেট কোনোটাই ছিল না ফোনে। 

আমি সেফ আছি। তবে আমার ভাইবোনেরা সেফ নাই অনেকেই। শত শত শিক্ষার্থী আহত হইছেন ঢাবি, জাবি, রাবিতে। আমার অনেক ছোটভাই ও বন্ধুরা আহত হইছে। এসব আমি লিখতে পারতেছি না আশলে। হাত অবশ হয়ে আসতেছে। 

আজ সকাল থেকে ঢাবির প্রত্যেকটা পয়েন্টে পুলিশের ব্যারিকেড ছিল। শাহবাগ থেকে কাঁটাবন এলাকায় অবস্থান নিছিল ছাত্রলীগ-যুবলীগ। তবু দুপুরের দিকে আমরা কয়েকজন শিক্ষকদের সমাবেশে যাই। ওনাদের অনুরোধ করি ভিসির সাথে আলাপ করতে। ওনারা ভিসির বাসভবনে যান। আমরা সেখানে বসে শ্লোগান দিই। কিন্তু ওনারা ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসেন। সেটাই স্বাভাবিক ছিল। তবু ওনারা যে আমাদের পাশে ছিলেন, সেজন্য ওনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ। 

গায়েবানা জানাজার আগেই আমরা আখতার ভাইরে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পাই। উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের শান্ত রাখতে দুই স্তরের ব্যারিকেড ব্যবস্থা তৈরি করা হয় পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে। আমরাই সেটা তৈরি করি। কেউ কোনোভাবেই চায় নাই যে অরাজক কিছু হোক। আমরা একটা শান্তিপূর্ণ সুশৃঙ্খল মিছিল চাইছিলাম শুধু। কিন্তু আইএমএলের গেট পর্যন্ত যাওয়ার আগেই রাজু ও ভিসি— দুদিক থেকে মিছিলে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল মারতে থাকে পুলিশ। শিক্ষার্থীরা দেয়াল টপকে আইএমএলের ভেতরে ঢুইকা গেট খুইলা দেয়। অনেকে ভেতরে ঢুকে পড়ে, অনেকে পেছনে ভিসির দিকে সরে আসে। পুলিশ ভেতরেও টিয়ার শেল মারতে থাকে। এমনকি প্রেসের ১০ জন লোক বারবার বলা সত্ত্বেও তাদের দিকে টিয়ার শেল মারা হয়। দেয়াল টপকাইতে গিয়া পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যথা পাই প্রচণ্ড, সাথে বৃষ্টির মত টিয়ার গ্যাসে চোখমুখ ব্যথায় জ্বলছিল। কোথাও দাঁড়ায়ে ধোঁয়া কিংবা পেস্ট নেওয়ারও সুযোগ পাইতেছিলাম না টিয়ার শেলের তোড়ে। কোনোরকম জান বাঁচিয়ে মল চত্ত্বরে ফিরি তখন। 

সেখানে আইসা দেখি যে সবাই মল চত্ত্বরে। অনেকে আহত। পুলিশ আস্তে আস্তে ভেতরে ঢোকে, এবং মল চত্ত্বরে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়তে থাকে। শিক্ষার্থীরা ওদিকের বিভিন্ন হলে আশ্রয় নেয়। বিকেল পর্যন্ত এই অবস্থা চলে। এরপর হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই আস্তে আস্তে হল ছাড়তে শুরু করে৷ তাদের জন্য মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণটা উন্মুক্ত রাখা হয়। সেখানে অবস্থানরত পুলিশ ততখনে ঢাকা কলেজের দিকে টিয়ার শেল মারতে মারতে সরে যায়। 

কিন্তু তোরণও সেফ ছিল না আশলে। ভিসি চত্বরের পুলিশ মার্চ করে করে সেদিকে আসে, এবং যখন মাত্র ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী পুলিশকে লক্ষ্য করে ভুয়া ভুয়া শ্লোগান দেয়, তখন তারা সেখানে কমপক্ষে ৭ টা টিয়ার শেল মারে তোরণে। পোলাপান দৌড়ে গাউসুল আজমের দিকে ঢুকলে যুবলীগের কিছু ক্যাডার তাদের উপর আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণের সময় আমাদের বন্ধু অর্ক আহত হন। 

এরপর ধীরে ধীরে আমরা সেখান থেকে সরে আসি। ক্যাম্পাসের কিছু ছোটভাইবোনদের নিয়ে খাওয়াদাওয়া করি এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। এরপর রাত সাড়ে ৮ টা নাগাদও শহিদ মিনার, কার্জনের হলগুলা ও নীলক্ষেতের দিকে শিক্ষার্থীদের উপর টিয়ার শেল ও গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। রাত সাড়ে ৮ টার দিকে কিছু শিক্ষার্থী স্রেফ বন্ধুদের খবর জানতে তোরণে যান। তাদের উপরেও গুলি ও টিয়ার শেল মারে পুলিশ। প্রত্যেকটা হলের গেটে অবস্থান নেয় তারা। শিক্ষার্থীদের হলগুলা থেকে বের করে দেওয়া হয়। ১০ টা নাগাদ হলগুলা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেলেও, পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়া বন্ধ হয় নাই। এখন ক্যাম্পাস মোটামুটি শান্ত। ভেতরে শিক্ষার্থী কিছু হয়ত আছে; বাট ক্যাম্পাস বেসিক্যালি পুলিশের দখলে। আমরা হল ধরে রাখতে পারি নাই সত্য, কিন্তু এও সত্য যে, ছাত্রলীগ এই হলের দখল নিতে পারে নাই। এই হল দখলের জন্য রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ ধ্বংসাত্মক শক্তি নিয়োগ করছে। এর বিরুদ্ধে কারুরই কিছুই করার ছিল না আশলে।

র‍্যাব, পুলিশ ও বিজিবি দিয়ে আজ ঢাবি, রাবি ও জাবিতে যে ক্র‍্যাকডাউন পরিস্থিতি তৈরি হইল, তা নজিরবিহীন। স্বাধীন বাঙলাদেশে ক্যাম্পাসগুলাতে এ ধরনের হামলা আর হইছে কিনা আমি জানি না। ইডেনের মেয়েদের জোর করে হলত্যাগে বাধ্য করা হয়। আর এই পুরাটাই করা হয় কেবল ছাত্রলীগরে হলগুলোর দখল দেওয়ার জন্য। দেশের প্রত্যেকটা ক্যাম্পাসের ইতিহাসে আজকের দিনটা একটা কালো দিন হিশেবে লেখা থাকবে। এই দিনটা প্রতিবছর নিশ্চয়ই কালো দিবস হিশেবে পালিত হবে। 

সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আজ ছাত্র-জনতা শিক্ষার্থীদের সাথে সংহতি জানায়ে আন্দোলন করছে। কাজলা-শনির আখড়ায় দেখলাম ছাত্র-জনতা পুরা এলাকায় আগুন জ্বালায়ে অবরোধ করতেছে। তারা ফ্লাইওভারের টোলঘর জ্বালায়ে দিছে, রায়েরবাগ পর্যন্ত রাস্তার মোড়ে মোড়ে আগুন জ্বালায়ে, ব্যারিকেড বসায়ে অবরোধ করতেছে। রাত ১২ টায়ও তাদের এই অবরোধ চলমান। আরো বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ চলছে। 

কাল সারাদেশে শাটডাউন কর্মসূচি দিছে শিক্ষার্থীরা।  পথেঘাটে প্রত্যেকটা মানুশ আজ শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলতেছে। যে সিএনজিতে ফিরছি, তার ড্রাইভার যাত্রাবাড়িতে আন্দোলনকারী পোলাপানরে খাওয়ার জন্য টাকা দিল। এক ছেলে আইসা আমারে জিগেশ করল, আপনে আওয়ামী লীগ না রাজাকার? আমি চুপ কইরা থাকলাম। সে বলল, ভয় পান? বলবেন, কোনোটাই না। আমরা বাঙলাদেশের মানুশ, নাগরিক। অবাক হয়ে গেলাম ছেলেটার এই উত্তরে। দেশের নতুন প্রজন্ম চেতনার বাইনারির বাইরে আইসা ভাবতে শিখছে। এ যে কী আনন্দের, তা কেবল অনুভবেরই বিষয়। 

বলছিলাম, এ আন্দোলন দমাইতে গেলে সরকারকে নিজের গায়ে এমন কলঙ্কের দাগ লাগাইতে হবে, যা সে মুছতে পারবে না আর কোনদিনও। সেই দাগ আজ চূড়ান্তভাবে লেগে গেছে। সামান্য একটা কোটা সিস্টেমের আন্দোলনরে কেন্দ্র করে এই সরকার দেশে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করছে। দেশের সর্বস্তরের মানুশ এখন ক্ষিপ্ত এই সরকারের উপর। প্রত্যেকটা ভার্সিটির প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্ট, জেলা সংগঠন ইত্যাদিতে ছাত্রলীগকে বয়কট করতেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা তাদের সাথে সহাবস্থানরে না বলতেছে। তারা এত বিশাল ক্র‍্যাকডাউনের মুখেও একটুও মনোবল হারায় নাই। পালটা ফাইট ব্যাক করছে ও করতেছে। এটা এই আন্দোলনের নতুন অর্জন। 

আজ যে দিনটা পার হইল, এইটা বাঙলাদেশে সত্যিকারার্থেই একটা আশুরার দিন। একটা জীবন্ত কারবালা আজ হাজির হইল এই বাঙলায়। হোসাইন জানতেন যে, কারবালায় তার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু তিনি যুদ্ধ কইরা গেছেন। আর কী আশ্চর্য, ওখান থেকেই এজিদের পতন শুরু হইছে। 

আজ, এই ১৭ জুলাই, বাঙলাদেশের কারবালার দিন। ফলে আজকের দিনটা আশলে ওদেরই পরাজয়ের দিন। র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি দিয়া ক্যাম্পাস দখল করলেও, ওরা বাঙলাদেশের মানুশের মনের দখল হারাইছে। সেই হারের বহিঃপ্রকাশ হয়ত আমরা দেখব, আজ বা কাল। ছাত্র-জনতার যে অভূতপূর্ব ঐক্য আজ বিরাজ করতেছে সারা বাঙলাদেশে, তা নজিরবিহীন। বহুদিন পর বাঙলাদেশ এ ধরনের ঐক্য প্রত্যক্ষ করল। ফলে আজকের দিনটা আল্টিমেটলি বাঙলাদেশরে তার মুক্তির দিকে এক ধাপ আগায়ে দিল বলা যায়। এই কারবালার শোকরে বাঙলার জনতা কীভাবে জিন্দা রাখবে, শক্তিতে পরিণত করবে, সে সিদ্ধান্ত এখন সম্পূর্ণই তাদের উপর।

দুপুর ১২টা ৬

আপডেট

১. ঢাবি ক্যাম্পাসের হলগুলা রাত ১২ টার পর থেকে প্রায় ফাঁকা ছিল। কিছু শিক্ষার্থী ছিল। তারা আজ হল ছাড়তেছে। ভিসি আর মেইন চেকপোস্টগুলায় পুলিশ-বিজিবি ছিল। লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতারা হলগুলাতে আসা-যাওয়ার মধ্যে আছে; তবে লীগ ঢোকে নাই পুরাপুরি। জাবি ও রাবির অবস্থা প্রায় সেম, তবে পুরা জানি না। সব ক্যাম্পাসে নেট অফ, নেটওয়ার্ক ডাউন। কিছু সরকারপন্থীবটিচার ক্যাম্পাসের ভিতর থেকে সম্প্রীতির কবিতা লিখতেছে। এদের পোস্ট অথেন্টিক না। 

২. সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পাবলিক ও প্রাইভেট ইউনিকেন্দ্রিক এলাকাগুলার মেসে মেসে তল্লাশি ও গ্রেফতার চলছে রাতে। মালিকদেরকে নির্দেশ দেওয়া হইছে পোলাপানরে মেস ত্যাগ করতে বলার। ছাত্রলীগ-যুবলীগের লোকেরাও এসব কাজে ব্যস্ত আছে। পরিচিত কারুর যদি এই অবস্থায় থাকার জায়গার দরকার হয়, যোগাযোগ কইরেন আমার সাথে। ছেলে বা মেয়ে। 

৩. আখতার ভাইকে গ্রেফতার দেখানো হইছে। এছাড়া তার আর কোনো খবর জানি না। 

৪. আজ সারাদেশে কমপ্লিট শাটডাউন পালন করতেছে ছাত্র-জনতা। পুলিশ ও ছাত্রলীগ একযোগে দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করতেছে। আজকের মেইন হামলাটা যাচ্ছে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ও কলেজগুলার উপর। এই মুহূর্তে ব্র‍্যাক ইউনি, বসুন্ধরা গেট, উত্তরা আজমপুর, মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের সাথে ছাত্রজনতার সংঘর্ষ চলতেছে। 

৫. ঢাকা-চিটাগাং রোডে কালকের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে এই আন্দোলনের আরেক শহিদ সিয়াম (১৮)। রাত থেকে এই রোডে চলতেছে শাটডাউন। রায়েরবাগ থেকে যাত্রাবাড়ী জনসমুদ্র।

১টা ৫৫

সারাদেশে ছাত্রজনতার উপর চলছে পুলিশ-বিজিবির তাণ্ডব। সাথে আছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। আজ ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাণ্ডব অব্যাহত আছে। সাস্টে হামলা হইছে, জাবিতে রেইড হইছে, ব্র‍্যাক ইউনি রণক্ষেত্র। আহতদের নিয়ে হসপিটালে যাউতে চাওয়া এম্বুলেন্সের ড্রাইভারকে গুলি করা হইছে। আহতরা চিকিৎসা পাইতেছে না। বিভিন্ন কলেজে হামলা হচ্ছে। প্রাইভেটের ভাইবোনেরা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করে যাইতেছে। 

এই মুহূর্তে ঢাবি, জাবি ও জবির সমন্বয়কেরা নিষ্ক্রিয়। এর কারণ আমরা বুঝি। কিন্তু পাবলিক ভার্সিটিগুলার আজ প্রাইভেটের পাশে দাঁড়ানো একান্ত জরুরি। তারা আপনার পাশে দাঁড়াইছে, আপনি দাঁড়াবেন না? পাবলিক ভার্সিটিগুলার যেসব স্টুডেন্ট ঢাকায় আছেন, আপনার নিজ নিজ ক্যাম্পাসের বন্ধুবান্ধবদের নিয়া একত্র হোন। ক্যাম্পাসের আশপাশে ছোট ছোট দলে অবস্থান নিন। কোনো হলে বেশি ছেলেপেলে থাকলে সেখানে অবস্থান নেন। কোনো অল আউট অ্যাটাকে না গিয়া আন্দোলনটারে গেরিলা রুপ দিন। মিছিল এবং উধাও। ব্লকেড এবং উধাও। এই পদ্ধতিতে আন্দোলন ধারাবাহিক হবে। প্রত্যেকটা পাবলিক ইউনির মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেন। 

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলার আশপাশে যারা আছেন, জনগণ, আপনারা আক্রান্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসুন। প্রত্যেকটা ক্যাম্পাসের আশপাশের লোকেরা শিক্ষার্থীদের খাবার, পানি, চিকিৎসা, বাসস্থান, ওয়াইফাই ও অন্যান্য সহায়তা দেন। 

সুশীল সমাজের ভূমিকা এই মুহূর্তে কী, জানি না। পেশাজীবীদের ভূমিকা কী, জানি না। আপনারা যদি এই আন্দোলনে আপনাদের ভূমিকা রাখতে না পারেন, তাইলে এই আন্দোলন ব্যর্থ হবে। আপনাদের ভূমিকা কী আশলে, আমি জানি না। যেটাই হোক, সে ভূমিকাটুক আপনারা একটু পালন করেন। কারণ, আপনারা সেইটা না করলে শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনটায় একা হয়ে পড়বে। ভয়াবহ নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হবে। আপনারা সেটা হতে দিয়েন না। প্লিজ

জুলাই ২৪, রাত ৮টা ৩

  · 

শারিরীকভাবে এখন পর্যন্ত সুস্থ আছি। কিন্তু মানসিকভাবে সুস্থ নাই। ভাই-বন্ধুদের অনেকেই আর এই দুনিয়ায় নাই। অনেকের খোঁজ নাই এখনো। শত শত শহিদের এই রক্তঋণ আরো কতদিন বয়ে চলতে হবে জানি না। কী ভয়ানক যন্ত্রণা, কী ভয়াবহ ট্রমা, কী হৃদয়বিদারক সাইলেন্স আর চোর-পুলিশ খেলার মধ্যে কাটাইছি গত কয়েকটা দিন, তার বিস্তারিত ফিরিস্তি দেওয়ার অবকাশ এখন নাই। 

গত শুক্রবার থেকে আজ পর্যন্ত যাত্রাবাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এলাকায় শহিদ হইছে বহু মানুশ। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হইছে, বাসাবাড়ির ছাদ থেকে স্নাইপিং করা হইছে, এমনকি আমাদের বাসার গলিতে ঢুকেও হেলিকপ্টার থেকে টার্গেট শুটিং হইছে। আন্দোলনকারী ছাত্রজনতার পাশাপাশি খুন হইছে অনেক সাধারণ পথচারী। সেরকমই একজনের জানাজা পড়ছি গত পরশু। 

ভাইব্রাদার সবার খোঁজ পাই নাই এখনও, জানি না কে কেমন আছে। সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার ও হান্নান মাসুদের খোঁজ পাই নাই। তাহির জামান প্রিয়’র শাহাদাতের খবর পাইলাম শুক্রবার। শুক্রবার শহিদ হইছে আরেক ছোটভাই সাকিব হোসেন। সেদিন সকালেই বন্ধুদের সাথে প্ল্যান করে দুপুরে রাস্তায় নামছিল ছেলেটা। আর ফেরে নাই। কপালে আর বুকে দুইটা বুলেট ওরে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে। এমন অনেকের আহত-নিহত-নিখোঁজ হওয়ার খবর পাচ্ছি। দোয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারতেছি না।

ইন্নালিল্লাহ পড়ি নাই। কারণ শহিদেরা মরে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলছেন, শহিদেরা জীবিত। ফলে শহিদদের রক্ত বৃথা যাবে না। ছাত্রজনতার এই কুরবানি বৃথা যাবে না। লাশগুলা ফিরে আসবে, প্রতিশোধ নেবে। ইনশাল্লাহ। 

ছবি: সাকিব হোসেন (২২)। সাকিন: কাজলা, যাত্রাবাড়ি। প্রতিষ্ঠান: দনিয়া কলেজ। ডিপার্টমেন্ট: বিবিএ।

জুলাই ২৫, রাত সোয়া ১২টা

গেল শুক্রবারের আগের শুক্রবার। শাহবাগে আন্দোলন শেষ কইরা ক্যাম্পাসের দিকে ফিরতেছিলাম, দেখা হইল নাহিদের ওয়াইফের সাথে। নাহিদ ও তার ওয়াইফ— দুইজনই আমার খুব ভালো বন্ধু। মেয়েটা টেনশনে ছিল খুব। সান্ত্বনা দিয়া বললাম, কিচ্ছু হবে না ওর, আমরা আছি না! 

কিন্তু আমরা থাকতে পারি নাই। এই অবর্ণনীয় যন্ত্রণা নাহিদ আর ওর ওয়াইফের একা সহ্য করতে হইছে। আমরা কিচ্ছু করতে পারি নাই। গত ৪ টা দিন কী অসহনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছে এই দম্পতি, আমরা তার সিকিভাগও অনুভব করতে পারি নাই। ক্যাম্পাসে আমার দেখা সবচাইতে পোলাইট, মৃদুভাষী আর হাসিমুখ ছেলেটা হইল নাহিদ। তার অবস্থা তো দেখতেই পারতেছেন। আর ওর ওয়াইফ, একদম ওর মতই, অল্প কথা বলে, মৃদু হাসে, কবিতা লেখে। মেয়েটা দিনরাত কী ভয়াবহ ট্রমা ফেস করছে, কী নিদারুণ বেদনায় বুকে পাথর বাইন্ধা এদিক ওদিক দৌড়াইছে, তা আমরা অনেকেই হয়ত জানি না। গুম হওয়ার পর প্রথম যখন ওদের গলা শুনি, সেখানে ভয় বা বেদনার কোনো ছাপ পাই নাই। যেন প্রতিদিনের মতই কথোপকথন, যেন টিএসসিতে চা খাইতেছি, ঠিক তেমনই ছিল ওদের গলার স্বর, বলার ভঙ্গি। শোকের শেষপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া মানুশ যেমন ইস্পাতদৃঢ় হয়, ঠিক তেমন একটা ভঙ্গি। 

আমার ঈর্ষা হয় এই দম্পতিরে। আমার বুকটা গর্বে উঁচা হয়ে যায় একথা ভাবলে যে, ওরা আমার বন্ধু। আমার নিজের উপর করুণা হয়, ঘেন্না হয় ভাবলে যে, ওদের জন্য আমি কিচ্ছু করতে পারি নাই। বন্ধুদম্পতি আমার, তোমরা নিরাপদে থাকো এই দোয়া করি। দেশের জন্য তোমাদের এই দৃঢ়তা, এই অবিচল আত্মত্যাগ, আমরা আজীবন মনে রাখব।

জুলাই ২৬, রাত সোয়া ২টা

আজ ক্যাম্পাসে গেলাম। হলগুলা এখনও ভ্যাকেন্ট। শুধু স্টাফ আর শিক্ষকরা আছেন। সব গেটে ব্যারিকেড আছে। ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলার কিছু সদস্য আছে। স্টাফরা পাশ দেখায়ে আসা-যাওয়া করতে পারতেছে। দুই একটা ব্যারিকেড দিয়ে রিকশাযোগে বা পায়ে হাঁইটা ক্যাম্পাসে ঢোকা যাইতেছে। ঢাকার রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলতেছে। জ্যামেরও দেখা মিলল। নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সেনাবাহিনীর অবস্থান থাকলেও, বাকি এলাকাগুলা স্বাভাবিক। স্বাভাবিক, বাট অ্যাপারেন্টলি। কারণ রাস্তার পুলিশ এখন যাচ্ছে বাড়ি বাড়ি। ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন। 

দুপুরে ঢাবির আইইআরের ছোটবোন লাবিবা জাহান ঐশির মেসেজ পাইলাম। ঐশির সাথে আমার দীর্ঘদিনের চেনাজানা। বুদ্ধিদীপ্ত একটা মেয়ে। ফেসবুকে কখনও রাজনীতি বা দেশের পলিটিকাল ইস্যু নিয়া তেমন কিছু লিখতে দেখি নাই ওরে।  হিউমারপ্রিয়, ফলে মিমপ্রীতি আছে ওর। তার বাইরে বিভিন্ন কালচারাল ইস্যুকেন্দ্রিক ডিবেটে অংশ নিতে দেখছি মাঝেমধ্যে। বাট পলিটিকাল ইস্যুতে ওকে কথা বলতে প্রায় কখনোই দেখি নাই। 

সেই ঐশি জানাইল যে, তাদের দরজা ধাক্কাইতেছে পুলিশ। গলায় ভয়, আতঙ্ক, ট্রমা আর অবিশ্বাস। দরজায় মুহূর্মুহু ধাক্কা। একপর্যায়ে পুলিশ দরজা ভেঙেই ওদের ঘরে ঢোকে। ভয়ে আতঙ্কে ঐশির তখন কী অবস্থা আমি জানি না। ঐশির মা একজন সিঙ্গেল মাদার। দুই ছেলেমেয়ে নিয়া এই শিক্ষিকার সংসার। বুঝতেছিলাম না কী করব। চেষ্টা করতেছিলাম আশপাশের মানুশদের ব্যাপারটা জানাইতে। বাট ততখনে পুলিশ ঢুকে পড়ছে ওদের ঘরে। ভেস্টপরা (নিরস্ত্র লোকদের ঘর থেকে ধইরা আনতেও ভেস্ট লাগে?) পুলিশ ওর মার দিকে বন্দুক তাক করে নাকি বলছে এই বাসা ছেড়ে চলে যাইতে। ওর ভাইয়ের ফোন চেক করছে; কাপড় উঁচা করে দেখতে বলছে, গুলির ক্ষত আছে কিনা। সবশেষে ওর ভাইটারে ধরে নিয়া যাওয়া হইছে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। বাসার সবার ফোন কেড়ে নেওয়া হইছে। 

এই ঘটনা পূর্ব রামপুরার। কিন্তু এরকম ঘটনা ঘটতেছে আরো বহু জায়গায়। আমার কাজের বুয়ার জামাইরে ধরে নিয়ে গেছে। অথচ লোকটা কী করছে কেউ জানে না। এই পুরা ঘটনায় ঐশির পাশে কেউ দাঁড়াইতে পারেন নাই। আমরা পারি নাই। এমন এক ভয়ের পরিবেশ, এমন এক বিচ্ছিন্নতা, এমন এক ট্রমাটিক এনভায়রনমেন্ট ওরা ক্রিয়েট করতে চাইতেছে, যেন কেউ কারুর বিপদে এমনকি পাশেও দাঁড়াইতে না পারে, না চায়। সবাই যেন হাশরের মাঠের মত ইয়া নাফসি জপতে থাকে। 

আমি ঐশির ব্যাচমেট, ডিপার্টমেন্টের বন্ধুবান্ধবী ও শিক্ষকদের আহ্বান জানাব, আপনারা ঐশির পাশে দাঁড়ান। সচেতন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের বলব, এই আহত, বিক্ষত, শঙ্কিত, ট্রমাটাইজড পরিবারটার পাশে দাঁড়ান। এরকম হাজারো পরিবার আছে আজ বাঙলাদেশে। এদের গল্পগুলা অ্যাটলিস্ট বলেন। হারায়ে যাইতে দিয়েন না।

বিকাল ৫টা ৪৫

কাল রাতে নাহিদ, আসিফদের কেবিনের বাইরে গোয়েন্দা পুলিশের ঘোরাঘুরির নিউজ দেখছি। আজ এখন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে আবারো তুলে নেওয়া হইছে মর্মে খবর পাচ্ছি। নাহিদের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন; নাহিদের বোন তার সাথে আছেন। তারা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে আছেন এবং তাদের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে। 

সাংবাদিক ভাইয়েরা প্লিজ খবরটা ভেরিফাই করে নিউজ পাবলিশ করেন। এই তিন ছাত্রের ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট ও টিচাররা তাদের ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেন। ঢাবির তিনজন ছাত্রনেতার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইতেছে, এই আবেদনগুলা ঢাবি প্রশাসনের কাছেই করা যুক্তিযুক্ত। বাট সেটা তো উলুবনে মুক্তোক্ষয়। তাই এখন ব্যাচমেট, ক্লাশমেট ও ডেপ্টের টিচাররাই ভরসা। আপনারা আওয়াজ তোলেন। একটা গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি দিনের পর দিন চলতে পারে না।

রাত ১১টা ৪২

নাহিদ ও আসিফের সাথে আবু বাকেরকেও হসপিটাল থেকে নিয়ে যাওয়া হইছে। বাকেরের নামটা অনেক মিডিয়ায় আসে নাই। ডিবি প্রধান বলছেন যে, শাদা পোশাকে যে কেউ তুলে নিতে পারে (বিবিসি বাংলা)। তবে যারা তুলে নিছেন, তারা গোয়েন্দা পরিচয়েই তুলে নিছেন। ফলে গোয়েন্দা পরিচয় ব্যবহার করে কারা দেশের নাগরিকদের তুলে নিয়ে যাইতেছেন, এ ব্যাপারে গোয়েন্দা বিভাগের কনসার্ন হওয়া উচিত বলে মনে করি। 

নাহিদের বোনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মোতাবেক, তাদেরকে রিলিজ করায়ে তেজগাঁর ইমপালস হসপিটালে ট্রান্সফারের কথা বলা হইছে। তবে সেখানে তাদের নেওয়া হইছে কিনা আদৌ, সে ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা ডিবির পক্ষ থেকে কিছু বলা হয় নাই। 

নাহিদের ওয়াইফ অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন, এখন তিনি কিছুটা সুস্থ আছেন। তবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। এই আন্দোলনের সূত্রে গ্রেফতার ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক আখতার হোসেনের ওয়াইফ এক বিবৃতিতে আখতার হোসেন, নাহিদ, আসিফ ও আবু বাকেরসহ সকল বন্দীদের মুক্তি দাবি করছেন৷ 

দেশব্যাপী ব্যাপক ধরপাকড়, গ্রেফতার ও রেইডের ফলে দেশে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এই ভয়ের পরিবেশ জারি থাকলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো খারাপই হইতে থাকার কথা। দেশের সচেতন নাগরিক ও সুশীল সমাজের কাছে আমার আবেদন থাকবে, আপনারা এই ছেলেগুলোর পরিবারের পাশে দাঁড়ান এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যার যার জায়গা থেকে সচেষ্ট হোন। পাশাপাশি দেশব্যাপী চলমান ধরপাকড় ও ভয়ের পরিবেশ তৈরির বিরুদ্ধেও কথা বলেন।

জুলাই ২৮, সকাল ১০টা ১৮

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জাবি শাখার সমন্বয়ক Arif Sohel কে গতকাল রাত ৩:১৫ মিনিটে তার আমবাগানের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়। আরিফ শুধু একজন সংগঠকই না, তিনি একজন চিন্তাশীল লেখকও বটে। জাবিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠচক্রও পরিচালনা করতেন সোহেল। 

বিভিন্ন মাধ্যমে যারা আমাকে খবরটা জানান, মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই, ভোর ৫ টার দিকে তাদের মধ্যে একজন, Nusrat Tabassum কেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। নুসরাত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাবি শাখার শামসুন্নাহার হলের একজন সমন্বয়ক। সাম্প্রতিক ঘটনার জেরে কোন নারীকে গুম করার এটিই সম্ভবত প্রথম ঘটনা৷ 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের একে একে তুলে নেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে চলতেছে গভীর রাতের রেইড, ব্যাপক ধরপাকড়, গুম ও গ্রেফতার। এখন মেয়েদেরও গুম করতে শুরু করেছে এই সরকার। এটা মারাত্মক অ্যালার্মিং একটা ব্যাপার। এই অবস্থায় দেশের মানবাধিকার সংস্থা, নারীদের অধিকার নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থা ও সচেতন নাগরিকদের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা ঐক্যবদ্ধভাবে এই ছেলেমেয়েগুলোর পাশে দাঁড়ান। ওদের সাথে হইতে থাকা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন। আজ যদি আপনারা চুপ থাকেন, তাইলে বাঙলাদেশের এই প্রজন্মের সবচাইতে মেধাবী ও সাহসী তরুণ নেতৃত্বের জীবন হুমকির মুখে পড়বে৷ জাতি হিশাবে এই কলঙ্ক ও ক্ষতির দায় সম্মিলিতভাবে আমাদের সবারই বহন করা লাগবে।

রাত ৯টা ৫৮

ডিবি অফিস থেকে প্রচারিত নাটকের দৃশ্যে আরিফ সোহেল নাই৷ আরিফ সোহেল কোথায়? আরিফ সোহেলকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাদের সামনে আনুন।

জুলাই ৩০, রাত ৩টা 

কিছু জরুরি আলাপ

১. বলপ্রয়োগ কইরা গণহত্যা চালায়ে ব্যর্থ হওয়ার পর প্রথমে সফট ও সরকারপ্রিয় সমন্বয়কদের দিয়া আন্দোলনে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হইছে। এরপর সমন্বয়কদের তুইলা নিয়া ভুয়া বিবৃতি দেওয়ানো হইছে। নানা ধরনের দফার ধোঁয়াশা তৈরি করা হইছে। কিন্তু দেশের ছাত্রজনতার সার্বিক ঐক্যের কারণে সেই চেষ্টা সফল হয় নাই। 

এখন ৯ দফাই ছাত্রজনতার একমাত্র দাবি। ফলে দফা দাবি নিয়া কোনো ধরনের বিভ্রান্তিতে ভুগবেন না। যেকোনো সমন্বয়কের তরফে কোনো অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য আসলেই হায় হায় শুরু করবেন না। ধৈর্য ধরবেন, ঐক্য বজায় রাখবেন এবং ধীরেসুস্থে পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে আগাবেন। 

২. অনলাইনে গ্রুপ হ্যাক করা, গুজববট ছড়ানোসহ আরো নানাভাবে স্যাবোটাজ করার ট্রাই করা হইছে এবং হবে। এ ব্যাপারে যেটা করবেন সেটা হইল, প্রথমত, অথেন্টিক গ্রুপ ও চ্যানেলে যুক্ত থাকবেন। দ্বিতীয়ত, গ্রুপ বা চ্যানেলের তথ্য বা নির্দেশনার চাইতে অথেন্টিক ব্যক্তিদের নির্দেশনারে গুরুত্ব দেবেন। ইনফরমেশন ক্রাইসিস বা অ্যানার্কির মুহূর্তগুলাতে এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে ভালো ফল পাবেন। 

৩. সমন্বয়কদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ এখনও দুর্বল। প্রত্যেক ইন্সটিটিউট ও ইউনিটের সমন্বয়করা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করবেন। নেট চলে গেলেও যেন কার্যকর যোগাযোগ থাকে নিজেদের মধ্যে, সেই সিস্টেম তৈরি করবেন। পাশাপাশি, প্রত্যেক ইউনিটের সমন্বয়করা নিজেদের পরে লিডারশিপের আরেকটা লেয়ার স্ট্যান্ড বাই রাখবেন। 

৪. শহিদদের বিস্তারিত তথ্য ডকুমেন্টেশন করতেছে প্রধানত ৩ টা টিম: শহীদ ডট ইনফো, সোচ্চার । Torture WatchDog Bangladesh ও Students Against Oppression। নিখোঁজ বা গুম হওয়াদের তথ্য সংগ্রহ করতেছে আমাদের কয়েকজন বন্ধুর একটা টিম। এছাড়া আরো নানাবিধ ডকুমেন্টেশন করতেছে বেশ কয়েকটা মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদ সংস্থা। এদের সবাইকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য সরবরাহ জারি রাখেন। 

৫. গ্রেফতারকৃতদের আইনি সহায়তা দিতেছে Progressive Lawyers-Bangladesh। পার্সোনালি Sabbir Sifat ভাই এই সংস্থাটির সাথে যুক্ত। যেকোনো আইনি প্রয়োজনে ওনাদের নক দেন। এছাড়া ‘লিগাল এইডস’ এর উদ্যোগ নেওয়া হইছে সমন্বয়কদের তরফেও। ওদের সাথেও যোগাযোগ করতে পারেন (যোগাযোগের লিংক কমেন্টে)।

এছাড়া আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইমার্জেন্সি হেলথ ফোর্স গঠন করা হইছে, যার দায়িত্বে আছে রিফাত, মাসুদ ও মাহিন। এ বিষয়ক যেকোনো দরকারে ওদের সাথে যোগাযোগ করবেন (লিংক কমেন্টে)। 

৬. আন্দোলনে সমন্বয় আরো বাড়াইতে হবে। দেশে যতগুলা গ্রুপ যতভাবে আন্দোলন করছেন, তাদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা জরুরি। প্রত্যেকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকাভিত্তিক ইউনিটের সমন্বয়করা ছাত্র সংগঠন ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জোটগুলার সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সার্বিক ঐক্যটা তৈরি করতে পারেন। এতে লাভ হবে। 

৭. মাঠের আন্দোলনে জায়গা নির্বাচনে সচেতন থাকবেন। ব্যাপক হামলা হইলে প্ল্যান বি কী হবে, তা আগে থেকে ভাইবা রাখবেন। আন্দোলনস্থলে হামলা থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়া যাবেন। এক্সিট রুটগুলা আগেই পর্যবেক্ষণ করে নেবেন। 

৮. এই সময়ে নানা ধরনের ডিসেপটিভ এলিমেন্ট মাঠে আসবে। সরকার তার অনেক সফট পাওয়ার ইউজ করবে। অনেক ‘সুশীল সমাজ’ অ্যাক্টিভ হবে।  তারা আন্দোলনে স্লো পয়জনিংয়ের মত সরকারি ন্যারেটিভ পুশ করার ট্রাই করবে। যেমন, তৃতীয় পক্ষের ন্যারেটিভ নিয়া আসবে তারা। এদের সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনে প্রত্যাখ্যান করা লাগবে।

আবার ফোকাস ঘোরানোর জন্যেও অনেক ধরনের গেম খেলা হবে। যেমন, জামাত-শিবির নিষিদ্ধকরণ। এটা এই সময়ে করার বেশকিছু কারণ আছে। এটা এক ধরনের ফাঁদ। আবার, ডিবির হারুন সাহেবরে নিয়া যেসব নাটক হচ্ছে, সেগুলাও ছোট ছোট ফাঁদ। এসব ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না।

৯. সতর্ক থাকা আর ভয়ে থাকা এক না। সরকার অনেক প্রযুক্তি কিনছে, অনেক ধরপাকড় চলছে সত্য। এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকা লাগবে। কিন্তু ব্যাপকভাবে ভয় বা গণহিস্ট্রিরিয়া ছড়াইতেছে, এমন ন্যারেটিভ বা এলিমেন্ট দেখলে সন্দেহ করা লাগবে আগে। যাচাইবাছাই করা লাগবে। 

১০. ক্যাম্পাসগুলা খোলার সাথেসাথেই ক্যাম্পাসে  সন্ত্রাসমূলক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা, হলে বৈধভাবে সিট দেওয়া ও ছাত্র সংসদ চালু করার দাবি তুলতে হবে। 

১১. প্রবাসীরা অলরেডি রেমিট্যান্স মুভমেন্ট শুরু করছেন। কিন্তু আপনাদের ভূমিকা রাখার জায়গা আরো ব্যাপক। শিক্ষার্থী ও অ্যাকাডেমিশিয়ানরা ইউনিভার্সিটিগুলায় সলিডারিটি কম্যুনিটি গড়ে তোলেন। স্টুডেন্টরা লাগাতার ডেমোনস্ট্রেশন করেন। বাঙলাদেশের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেন। অ্যাকাডেমিশিয়ানরা মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ অন্যান্য বিষয়ে বিশ্ববাসীকে সচেতন করেন। বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে আন্দোলন করেন। বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন ইত্যাদির কাছে বাঙলাদেশের আওয়াজ পৌঁছে দেন। একটা শক্তিশালী ইন্টারন্যাশনাল লবির অভাবে বাঙলাদেশের মুক্তিকামী মানুশ ভুগছে। আপনারা সেই লবিটা তৈরির কাজে মনোযোগ দেন। 

ছাত্রজনতার এই ইনকেলাব সফল হোক। ফি আমানিল্লাহ।

আগস্ট ২, রাত ১টা ২৯

৩৩ জুলাই শুক্রবা‌রের যত প্রোগ্রাম: 

১. ঢা‌মেকসহ সকল মে‌ডি‌কে‌লের ছাত্র-ইন্টার্ন ডাক্তার ও শিক্ষক। সকাল ১০টায়, জাতীয় শহীদ মিনা‌রে।

২. জুলাই গণহত্যায় ‘বিক্ষুব্ধ কবি-লেখক সমাজ’। সকাল ১১ টায়, বিশ্বসা‌হিত‌্য কেন্দ্র, বাংলামটর

৩. ‘গণহত্যা ও নিপীড়নবিরোধী শিল্পীসমাজ’। সকাল ১১ টায়, সাত মসজিদ রোড, আবাহনী মা‌ঠের পা‌শে, ধানম‌ন্ডি।

৪. নাগরিক সমাজের ‘শোক র‍্যালি’। সকাল ১১ টায়, প্রেসক্লাবের সাম‌নে।

৫. খুনের দায়ভার নিয়ে স্বৈরাচারের পদত্যাগের দাবিতে ‘শিক্ষার্থী-জনতার দ্রোহযাত্রা’। বিকেল ৩ টায়, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে। 

৬. ‘ছাত্রদের পাশে মা’। বিকেল ৪ টা, চেরাগি পাহাড়, চট্টগ্রাম। 

৭. গণহত্যা, গুম, খুন ও হামলায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা ছাত্র ঐক্যের ‘ছাত্রবিক্ষোভ’। বাদ জুমা, বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইট।

৮. রা‌জশাহী বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য়ের শিক্ষকদের শোকযাত্রা। সকাল ১১টা, রা‌বি শহীদ মিনার।

২. মিরপুর ১২, মা‌টিকাটা এলাকায় গণ‌মি‌ছিল। বিকাল ৩টা। 

১. সাইন্স ল্যাব বাইতুল মা’মুর জামে মসজিদ থে‌কে জুমার পর একসা‌থে নাম‌বে ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ রউফ কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর পাবলিক কলেজের ছাত্ররা।

১০. বিকাল ৩:০০টায় যশোরের পালবা‌ড়ি এলাকা থে‌কে মা‌ঠে নাম‌বে ছাত্ররা।

১১. NSU ৮ নং গেইটে সকাল ১১ টা থেকে গ্রাফিতি অংকন ও প্রতিবাদী শ্লোগান। জুমার পর প্রতিবাদ ও গণমিছিল। 

আরো যেসব প্রোগ্রাম আছে কাল, কমেন্টে সেগুলোর কথা জানাইতে পারেন।

আগস্ট ২, বিকাল ৪টা ১৩

প্রায় ৮ কিলোমিটার লম্বা ছাত্রজনতার দ্রোহযাত্রা রাজু ঘুরে এই মুহূর্তে শহিদ মিনারে৷ ছাত্র, জনতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, কবি, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুসজের ঢল নামছে শহিদ মিনারে৷ এই লড়াই বৃথা যাবে না।

আগস্ট ৩, রাত ২টা ৩৫

প্রেসক্লাব থেকে আজ [২রা আগস্ট] হাজার হাজার মানুশের মিছিল রাজু ঘুইরা শহিদ মিনারে অবস্থান নিছিলো। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী— ডান-বাম বা দলমত নির্বিশেষে সব ধরনের মানুশের অংশগ্রহণ করার ফলেই মিছিলটা এত বড় হইতে পারছিল। শিবির নিষিদ্ধ কইরা আ. লীগ যে গণজাগরণ বা শাহবাগের রাজনীতি তৈরি করতে চাইছিল, আজকের এই মিছিল সে সম্ভাবনারে নস্যাৎ করে দিছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ‘বাম-ডান একত্র হলো।’ সম্ভবত এই মিছিলের কথাই বলছেন। 

শাপলা-শাহবাগের যে কালচারাল রাজনীতি তৈরি করে দেশরে বিভাজিত করে রাখা হইছিল বহুদিন, সেই বিভাজনটা যে আর কার্যত ওয়ার্ক করতেছে না, আজকের এই মিছিল তারই প্রমাণ। বাম সংগঠনগুলার একটা প্রধান অংশ এই মিছিলের মধ্য দিয়ে জানায়ে দিছেন যে, তারা আর শাপলা-শাহবাগের আওয়ামি বাইনারিতে ফল করতে রাজি না। ফলে সরকার এখন হয়ত সরকারপন্থী কিছু বামদের নিয়া একটা নতুন গজা মঞ্চ তৈরি করতে তৎপর। 

যদিও এতবড় মিছিল নিয়া যা যা করা যাইত, তা তা করা হয় নাই। হয়ত কারো কারো মধ্যে এখনও নানা ধরনের দ্বিধা আছে। এখনও অনেকের মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতির মধ্য দিয়া চিন্তার রুপান্তর ও বাইনারি ভাঙার ব্যাপারে নানা ভয় ও দ্বন্দ্ব আছে। দু পক্ষেরই। এসব দ্বিধা দ্রুত ঝাইড়া ফেইলা নয়া বাঙলাদেশের জন্য নয়া রাজনৈতিক মোর্চা তৈরিতে অংশ নিতে না পারলে, বাঙলাদেশে আ. লীগ ফ্যাসিলিটেড কালচারাল ওয়রের পতন ঘটায়ে নতুন কালচারাল বিনির্মানে অংশ নিতে না পারলে, যে সংকট আজ আমাদের এই জায়গায় আইনা ফেলছে, সে সংকট দূর হবে না। 

এই মিছিল থেকে আজ ১ দফা তথা সরকারের পদত্যাগের দাবি উঠছে। সারাদেশে ছাত্রজনতার যে ঢল নামছিল, প্রায় সব জায়গা থেকেই আজ এক দফার দাবি উঠছে। সবাই ফেসবুকেও প্রোপিক বদলাচ্ছে। মানুশের সামনে ডিরেকশন এখন পরিষ্কার। আজ, ৩৩ জুলাই (২ আগস্ট), অলিখিতভাবে বাঙলাদেশের ছাত্রজনতা এই সরকারের পতন ঘোষণা করছে। 

আজও সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ গুলি করছে, লীগের লোকেরা হামলা করছে। শহিদ হইছে একাধিক আন্দোলনকারী। কাল সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ডাকছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। পরশু থেকে তারা অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিছে। যদিও এক দফার কথা তারা এখনও বলছে না, তবু এরমধ্য দিয়ে টেকনিকালি এক ধরনের সিগন্যাল তারা দিয়ে দিছে। 

কিন্তু এই আন্দোলনকে যদি একটা গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দিতে হয়, তাইলে আমাদের বিপ্লব ও বিপ্লব-পরবর্তী দেশগঠনের রূপরেখা নিয়া ভাবা লাগবে। আগেই বলছি, ফ্যাসিবাদবিরোধী সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য করা লাগবে। রাজনৈতিক দলগুলার জোট গঠন করতে হবে। নেতৃত্বের জায়গাগুলারে আরো বিস্তৃত করতে হবে। দেশের সর্বস্তরের জনতা, ফ্যাসিস্টবিরোধী পলিটিকাল অ্যাক্টর ও স্টেকহোল্ডারদের কানেক্ট করা লাগবে। এখন এই ঘটনাগুলো ঘটিয়ে তুলতে পারলেই কেবল, গণ-অভ্যুত্থান ও বিপ্লব-পরবর্তী দেশগঠনের রূপরেখা একটা সামগ্রিক ভিত্তি পাবে। নাইলে এই বিপ্লবের গর্ভে শুরু থেকেই জমে উঠবে নানা ধরনের প্রতিবিপ্লব। এমনকি সেটা করতে না পারলে এই বিপ্লব ব্যর্থও হইতে পারে। আরেকটা ১/১১ পরিস্থিতি তৈরি হইতে পারে। 

সেটা হবে না এই আশাই করি আমরা। আজ সারাদেশে যে জনদাবি উঠছে, অচিরেই সেই জনদাবির প্রেক্ষিতে এই আন্দোলন এক দফার আন্দোলনে পরিণত হবে মনে হচ্ছে— তা সমন্বয়করা বলুক বা না বলুক। সেই আন্দোলন কতটা সমন্বিত হবে, কতটা ঐক্যবদ্ধ ও কমপ্যাক্ট হবে, কতটা গণতান্ত্রিক হবে, আন্দোলনের ভিতর দিয়া বিপ্লবী শক্তিগুলা কতটা ম্যাচুর কায়দায় দেশগঠনের পরবর্তী রূপরেখা সামনে নিয়া আসতে পারবে— সেসবের উপরেই আন্দোলনের সফলতা নির্ভর করবে। স্বার্থপরতা তো অনেক হইল, এবার সবাই অন্তত নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কিছু করেন। 

ইনকেলাব জিন্দাবাদ।

বিকাল ৩টা ১৫

যাত্রাবাড়ি ঢাকার সাথে দেশের অন্তত ৩ টা গুরুত্বপূর্ণ জেলার একমাত্র সংযোগস্থল। ফলে এখানে স্বাভাবিকভাবেই সরকারি প্রোটেকশন বেশি। যাত্রাবাড়ি অচল হওয়া মানে কার্যত ঢাকার সাপ্লাই চেন অচল হয়ে যাওয়া। ফলে এই অভ্যুত্থানের প্রথম ফেজে যাত্রাবাড়িতে ব্রুটাল ম্যাসাকার ঘটছে। 

যাত্রাবাড়ি একটা অনুন্নত এলাকা। মিডল ক্লাশ বা লোয়ার মিডল ক্লাশদের এলাকা। তেমন নামকরা কোনো ইউনিভার্সিটিও নাই এখানে। এখানকার ছাত্রদের তেমন কোনো প্রোটেকশনও নাই। নিম্নবিত্তদের গণগ্রেফতার বা বাড়িতে বাড়িতে হামলা ঠেকাবার কেউ নাই। তবু জানমালের সমূহ ঝুঁকি নিয়া এখানকার ছাত্রজনতা দ্বিতীয়বারের মত যাত্রাবাড়ি থেকে মাতুয়াইল পর্যন্ত ব্লক করে দিছে।

হয়ত আবার ম্যাসাকার হবে এই এলাকায়। কিন্তু জুলাইয়ের এই অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ির বীর ছাত্রজনতার আত্মত্যাগ সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে৷ ইনকেলাব জিন্দাবাদ।

আগস্ট ৪, সকাল ১১টা ২৭

শাহবাগে ধাওয়া খেয়ে ভাগছে সোনার পোলারা। আশপাশেই থাইকো বাবারা, আইতাছি।

সুপুর ১টা ৫১

বাংলামোটর মোড়ে ছাত্রলীগ হামলা করছে। গুলি করতেছে৷ বেশ কয়েকজন আহত। শাহবাগ থেকে বাংলামোটর সন্ত্রাসীদের ধাওয়া দেন।

১টা ৫৭

বাংলামোটরে ২ জন গুলিবিদ্ধ। একজন পায়ে, একজন বুকে।

বিকাল ৫টা ৪৫

শাহবাগ, ক্যাম্পাস, সাইন্সল্যাব ছাত্রজনতার দখলে৷ কিছু হলের তালা ভেঙে ফেলছে ছাত্ররা৷ হলের শিক্ষার্থীরা দলে দলে হলে ফেরেন। হল না খুললে তালা ভেঙে ঢোকেন। হলে হলে মুক্তাঞ্চল তৈরি করেন৷ 

জিগাতলায় গুলি করতেছে ছাত্রলীগের গুণ্ডারা৷ ওরা বেক্সিমকোর ইয়েলো রেস্টুরেন্টে আগুন দিছে নাশকতা করার উদ্দেশ্যে। ওখানে অনেকেই গুলিবিদ্ধ। শাহবাগ ও আশপাশের জনতার একাংশ সাইন্সল্যাবের দিকে যাচ্ছে৷ 

যাত্রাবাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জ পুরাটাই মুক্তাঞ্চল। লীগ দুই এক জায়গায় আছে৷ বাট অরা কিছুই তেমন করতে পারে নাই। শনির আখরা আর রায়েরবাগে যে দৃশ্য দেখছি সেটা অদ্ভুত৷ মায়েরা তাদের বাচ্চাদের শ্লোগান শিখাইতেছে। বাবারা তার বাচ্চার হাতে লাঠি তুইলা দিতেছে৷ রিকশায় লাঠিসহ বাচ্চারে নিয়া মিছিলে আসতেছে৷ যাত্রাবাড়ির বীর জনতারে আমার লাল সালাম! 

ঢাকায় উত্তরা ও মিরপুরে ওরা গুলি চালাইছে৷ এখনও বাংলা মটর ও মৎস ভবনে গোলাগুলি করতেছে ওরা। ৩-৪ জন ডেডলি ইঞ্জুরড এইমাত্র শাহবাগ দিয়া গেল। সারাদেশে প্রায় ৪০ জন শহিদ। গুলিস্তানের কিছু জায়গায় অবস্থান নিয়া আছে। আর অদের মেইন পার্টি অফিসগুলায় অবস্থান নিছে৷ সারাদেশে ওরা আজও সন্ত্রাস করছে, গুলি ছুঁড়ছে, পাশাপাশি ব্যাপক নাশকতা চালাচ্ছে৷ সর্বাত্মক প্রতিরোধ ছাড়া আর উপায় নাই। 

ইনকেলাব জিন্দাবাদ।

সন্ধ্যা ৭টা ৭

শেষ বিকালে আবার হিংস্র হয়ে উঠছে এই ফ্যাসিস্ট সরকার। জিগাতলায় আজ সারাদিন গোলাগুলি হইছে, আহত হইছে অসংখ্য মানুশ। বাংলামোটর, কাওরানবাজার, মৎস ভবন ও পল্টন এলাকায় ওরা গোলাগুলি করতেছে এখন৷ ডিএমসি থেকে ৪ টা লাশ এনে রাখা হইছিল শহিদ মিনারে, যেগুলা আনরেজিস্ট্রার্ড। রেজিস্ট্রার্ড লাশ ছিল আরো ৩ টা। ছাত্রজনতা টিএসসি থেকে শাহবাগ লাশ নিয়া মিছিল করছে৷ যে শাহবাগ থানাকে সারাদিন পাবলিক ব্যারিকেড দিয়া প্রোটেকশন দিয়া রাখছে, তারা এখন বের হয়ে গোলাগুলি করতেছে, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড মারতেছে। টিএসসি পর্যন্ত চলে আসছে ওরা গোলাগুলি করতে করতে। কাওরানবাজার আর মৎসভবন এলাকায় অনেকেই হতাহত হচ্ছেন। 

কার্ফ্যুর আড়াল নিয়া লীগের সন্ত্রাসী আর পুলিশ ছাত্রজনতার উপরে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। দেশকে ওরা গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে৷ আবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে ম্যাসাকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজেরা নাশকতা কইরা জঙ্গি ন্যারেটিভ পুশ করতেছে, যেটা বেসিক্যালি ইন্ডিয়ার প্রেসক্রিপশন৷ আর্মি বেসিক্যালি এই খুনের বিরুদ্ধে নীরব ভূমিকা পালন করতেছে। আরো কত রক্ত ওরা ঝড়াবে জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, পতন ওদের হইতেই হবে। সুতরাং ঐক্যবদ্ধ হোন, রাস্তায় নামেন। ঢাকা আসেন সবাই। ইনকেলাব জিন্দাবাদ।

আপডেট

বিকাল ৪ টা পর্যন্ত শাহবাগ থেকে সাইন্সল্যাব ছাত্রজনতার দখলে ছিল। কিন্তু ৪ টার পর থেকে পরিস্থিতি খারাপ হওয়া শুরু করে। বাংলা মটর ও কারওয়ান বাজারের দিকে সন্ত্রাসী বাহিনীর অবস্থান ছিল। সকালেও এক দফা গোলাগুলি হইছে ওখানে, অনেকে আহত হইছে। জিগাতলায় দুপুর থেকেই সন্ত্রাসীদের গুলিতে অনেকে শহিদ ও আহত হইছে। কিন্তু বিকালে শাহবাগের অবস্থা খারাপ হইতে শুরু করে। ততখনে বাংলা মোটর ও মৎস ভবনের দিক থেকে হামলা শুরু করে সন্ত্রাসীরা। 

বাংলা মোটর ও কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে বিকালে ২ টা লাশ যায় শাহবাগ হয়ে। উত্তেজিত ছাত্রজনতা কন্টিনেন্টালের দিকে আগানোর পর বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের ভেতর থেকে গুলি করা হয়। পুলিশও গুলি করে।  এদিকে শাহবাগ ফাঁকা হয়ে যায়। পুলিশ অবস্থান নিয়ে নেয়। পুলিশ-ছাত্রলীগের আক্রমণে দিশাহারা ছাত্রজনতা শাহবাগের দিকে ব্যাক করে থানার দিকে ইট-পাটকেল ছোঁড়ার পর পুলিশ গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়া শুরু করে। সারাদিন ছাত্রজনতা শাহবাগ থানার সামনে ব্যারিকেড দিয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে রাখছিল। কিন্তু ওরা সুযোগ পেয়েই গুলি চালায় ছাত্রজনতার বুকে। সেখানে দুই নারীসহ অনেকে আহত হয়। অনেকে গ্রেফতার হয়। অনেকে টিএসসির দিকে ফিরে আসে। 

উত্তেজিত ছাত্রজনতা ঢামেক থেকে ৪ টা লাশ বের করে আনে। তারা লাশ নিয়া মিছিল কইরা আবার যায় শাহবাগের দিকে। পুলিশ নির্মমভাবে গুলি করতে করতে রাজু পর্যন্ত চলে আসে। তখন লাশের মিছিলটা কাঁটাবন হয়ে সাইন্সল্যাবের দিকে যায়। লাশগুলার কী হইছে জানি না। 

রাত সাড়ে আটটার দিকে আমরা কয়েকজন বন্ধু শহিদ মিনার গিয়া দেখি যে, এখনও দুইটা লাশ সেখানে পইড়া আছে। তাদের ঘিরে আছে ৫০-৬০ জনের মত লোক। দুইজনেরই পরিচয় অজ্ঞাত। এদের একজন আসছে জিগাতলা থেকে, একজন বাংলা মোটর। লাশ দুইটার ছবি তুইলা আমরা ঢামেকে নিয়া যাইতে চাই। কিন্তু উপস্থিত ছাত্রজনতার মধ্যে সন্দেহজনক একটা গ্রুপ লাশ নিতে দেয় না। তারা লাশগুলা অন্যত্র নিয়া যাইতে চায়। যতবার আমরা লাশ দুইটা ঢামেকে নিতে চাই, তারা বাধা দেয়। শেষমেশ একজনকে একটা লাশের আত্মীয় বানানো হয়, এবং সে যে ফেক তা সবাই বুইঝা ফেলে। ফলে লাশ ঢামেকে নেওয়ার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়। 

দুইটা ইজিবাইকে দুইটা লাশ নিয়া আমরা ঢামেকের দিকে আগাইতে চাই। কিন্তু একটা ইজিবাইক মুর্তজা মেডিকেলের সামনে নিয়া গিয়াই দেখি যে, পেছনে আরেকটা ইজিবাইক আটকে রাখছে ওই সন্দেহজনক গ্রুপটা। এবং মুহূর্তের মধ্যেই চানখারপুলের দিকে থেকে পুলিশ (আমার ধারণা সাথে উপস্থিত জনতার মধ্যে মিশে থাকা সন্ত্রাসীরাও ছিল) আইসা গুলি করা শুরু করে। একটা লাশ ঢামেকে নেওয়া গেলেও আরেকটা লাশের ভাগ্যে কী ঘটছে জানি না। 

প্রথম আলোর দেওয়া তথ্যমতে শুধু জিগাতলা, ফার্মগেট, শাহবাগ, বাংলা মোটর, যাত্রাবাড়ি ইত্যাদি এলাকায় ১১ জন নিহত হইছে। আহত শতাধিক। রাত ৯ টায় ঢামেকের রেজিস্ট্রার্ড নিহতই ছিল ৭ জন। সারাদেশে আজ প্রায় শতাধিক মানুশ খুন করছে ওরা। কালকেই বলছিলাম যে, ওরা শুধু আক্রমণ করবে না। হামলা করবে, সাথে নাশকতাও করবে। সেটাই সত্য হইল। ইয়েলো টাওয়ারসহ বিভিন্ন থানায় হামলা ও নাশকতামূলক নানা কর্মকাণ্ড করছে। এখন ওরা পূর্বপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলা ও জঙ্গি গেম খেলার ট্রাই করতেছে। ফোনে ফোনে জঙ্গি হামলার মেসেজ পাঠাচ্ছে৷ 

এই সরকার ক্ষমতায় থাকতে চাইতেছে এখন স্রেফ গুলির জোরে। সন্ত্রাসের জোরে। গুজবের জোরে। আর্মি বলছে তারা জানমালের হেফাজত করবে, কিন্তু কই? তারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হইছে। হাইকোর্টে রিট খারিজ হওয়ার পর পুলিশ পুরাদমে গুলি করা শুরু করে দিছে। শহিদ মিনারের পাদদেশে পইড়া থাকা নাম না জানা দুইটা লাশও ওরা আমাদের মেডিকেলে নিতে দেয় নাই। 

ফলে ছাত্রজনতার সবপক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এখন এই সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভ্যুত্থানের দিকে আগাইতে হবে সকলকে। কাল ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি দেওয়া হইছে। এই স্বৈরাচারের সকল গুজব ও ভুয়া ন্যারেটিভকে মিথ্যা প্রমাণ কইরা, জালিমশাহির পেশিশক্তিরে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের রুহানি শক্তি দিয়া পরাজিত কইরা, কাল সকলে ঢাকা অভিমুখে মার্চ করেন। ভার্সিটির হলের ছাত্ররা এক হয়ে হলগুলার দখল নেন। এত রক্ত, এত কান্না, এত ত্যাগের পরে স্বৈরাচার হটানো ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নাই। 

ইনকেলাব জিন্দাবাদ।

৫ আগস্ট

শ্লোগানে শ্লোগানে উত্তাল শাগবাগ:

 এই মুহূর্তে খবর এল

খুনি হাসিনা পালিয়ে গেল

এই মুহূর্তে খবর এল

বাঙলাদেশ স্বাধীন হল

Loading

Scroll to Top